ভারতবর্ষে ১৫০০-৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতিসমূহ ও লোহার আগমন

Table of Contents

ভারতবর্ষে প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতি নির্ণয়ের ইতিহাস ও দুরভিসন্ধিসমূহ

হোমারের মহান গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াডের ট্রয়ে (তুর্কী) ট্রোজান যুদ্ধের যে শহরের উদ্দেশ্যে গাথা রচিত হয়েছে, সেই ট্রয়ে (তুর্কী) যখন ১৯৭১ সালে হেনরিক স্কেলইম্যান (Heinrich Schleimann) খননকার্য শুরু করলেন, সেই মুহূর্তটি প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে একটি নাটকীয় মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেল। নগরীর অষ্টম স্তরের ভবনগুলোর এবং দুর্গের ভিত্তি আবিষ্কারে ক্লেইম্যানের সাফল্যের পর দেখা গেল, হোমারের গাথায় বর্ণিত নগরী রয়েছে এর যষ্ঠ স্তরে। কোনো বিজয়ী সেনাবাহিনী নয়, বরং বিধ্বংসী ভূমিকম্পেই ধ্বংস হয়েছে হোমারের নগরী। স্কেলইম্যানের অভিযানের পর অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ ওইসব প্রাচীন মহাকাব্যের পরম্পরা প্রমাণ করতে কিংবা অন্ত পক্ষে সেগুলো পরীক্ষা করার জন্য মহাকাব্যে নামাঙ্কিত স্থানগুলোর খননকার্যে অন্তত উৎসাহিত হয়েছিলেন। আর সেই সিলসিলা চলে এলো ভারতবর্ষেও, যেখানেও মহাকাব্যের একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার রয়েছে।

মহাভারতে ভরতবংশীয়দের বিরাট যুদ্ধটি বিধৃত। কিন্তু এরই সঙ্গে সেখানে আরো অনেক দার্শনিক, বিশ্লেষণী এবং পৌরাণিক উপাদান রয়েছে। অন্তর্সাক্ষ্য এবং বহিউল্লেখে দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর পর থেকে এটি পর্বে পর্বে সংকলিত এবং নিশ্চিতরূপে চতুর্থ শতাব্দীতে সম্পূর্ণ। যুদ্ধটির কিছু পরে যা আসে তাকে মহাভারতে ‘কলি যুগ’ বলা হচ্ছে। মহাভারতের যুদ্ধের পরেই এই যুগ শুরু হয়েছে, আর এই বিশ্বাসে স্থানীয়রা ধরে নিল যে এর প্রারম্ভকাল ৩১০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এই যুগের জন্য সময়কালটি ব্যাপ্ত করা প্রয়োজন হলো, যার কাজে পৌরাণিক ইতিহাসের নানান রচনা এগিয়ে এল যেগুলোকে পুরাণ বলা হয়। অতীত জ্যোতির্বিদ্যক ঘটনাগুলোকে ওই বিশেষ ঐতিহাসিক যুগের অন্তর্গত করার জন্য জ্যোতির্বিদরাই প্রধানত ওই কালপর্বটি নির্দিষ্ট করেছিল।

মহাভারত, রামায়ণ এবং পুরাণগুলোর থেকে সম্ভাব্য ঐতিহাসিক উপাদান খুঁজে বার করার জন্য প্রভূত চেষ্টা করা হয়েছে। এফ ই পার্গিটার তার ‘কলি যুগের রাজবংশ’-গ্রন্থে পৌরাণিক প্রমাণগুলো বিন্যস্ত করেছেন। প্রকৃত জীবনে-নির্ধারিত গড় রাজত্বকালের সূত্রের ভিত্তিতে তিনি প্রথমে পৌরাণিক কালপঞ্জী পুনর্গণনা করলেন। তারপর এরই সাহায্যে তিনি পৌরাণিক রাজত্বকালগুলোকে বর্জন করে সময় এবং ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান কমিয়ে আনলেন। তার হিসেবমতো মহাভারতের যুদ্ধের প্রায়িক সময়কাল ৯৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।

স্বাধীনতার অল্প কিছু পরে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের একজন উৎসাহী আধিকারিক বি. বি. লাল তার ট্রয় নগরী খুঁজে পেলেন এবং সেটির খননকার্য শুরু করলেন। সেটি পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে গঙ্গার তীরে অবস্থিত হস্তিনাপুর, মহাভারতে বর্ণিত কুরুদের রাজধানী। কোনো দূর্গ কিংবা প্রাসাদ পাওয়া গেল না। কিন্তু ১৯৫০-৫২ সময়কাল যাবৎ খননকার্য চালাবার পর বি. বি. লাল ঘোষণা করলেন যে, নিম্নলিখিত আবিষ্কারগুলোর সাহায্যে তিনি মহাভারতের ঐতিহাসিকতার প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন:

  • (১) মহাভারতে উল্লিখিত প্রধান প্রধান স্থানসমূহ যেমন হস্তিনাপুর, অহিচ্ছত্র, মথুরা এবং কুরুক্ষেত্র, এই সব স্থানেই চিত্রিত ধূসর সামগ্রির (Painted Grey Ware (PGW)) সন্ধান মিলেছে। অতএব, এখানে PGW কালটি অবশ্যই একই সঙ্গে, সময়ের একই ব্যাপ্তিকে অবস্থিত ছিল। মহাভারতে উল্লিখিত নয় এমন কয়েকটি স্থান, যেগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দারা মহাভারতের সংশ্লিষ্ট হিসেবে দাবি করে, সেখানে PGW-এর সন্ধান পাওয়া অত্যন্ত আনন্দদায়ক ঘটনা। কাজের PGW-যুগটিই মহাভারতে বর্ণিত ঘটনাবলীর সময়কাল হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
  • (২) বি. বি. লালের বিচারে, একদিকে PGW যুগের সময়কাল সাধারণভাবে হলো খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-৬০০ অব্দ; আবার সেইসঙ্গে উত্তুরে কালো পালিশ-করা সামগ্রির (Northern Black Ware) (NBP) নীচে জমে-থাকা অবশেষের ভিত্তিতে হস্তিনাপুরের PGW-যুগের সময় স্থির হলো খ্রিস্টপূর্ব ১১০০-৮০০ অব্দ। মূল PGW যুগে কেবল ‘একেবারে ওপরের স্তরে’ লোহার দণ্ড পাওয়া যায় বলে একে প্রাক লৌহযুগ বলা হয়। এই তথ্যের ভিত্তিতেই শ্রীলালের প্রথম সময়কাল (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-৬০০) স্থির করা হয়েছে। তাছাড়া একমাত্র PGW যুগেই ‘সাধারণভাবে লোহার ব্যবহার প্রথম চোখে পড়ে।’  মনে করা হয় যে, এইভাবে পাওয়া PGW-এর তারিখে মহাভারতের ঐতিহাসিকতা প্রমাণ করা গেল। অথচ PGW-যুগের মধ্যে বি লাল নিজেই হস্তিনাপুরের যে সময়কালটি স্থির করলেন, সেটি পার্গিটার নির্ণীত মহাভারতের যুদ্ধের সময়কালের (খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০) থেকে সামান্য ‘একটু পরিবর্তিত’ এমন হতেই পারে না।
  • (৩) হস্তিনাপুরে কোনো রাজকীয় ভবন পাওয়া না গেলেও বন্যার চিহ্ন ছিল। পরবর্তী পরম্পরায় যে বন্যায় হস্তিনাপুর পরিত্যক্ত হয়েছিল বলে মনে করা হয়, এটি সেই বন্যা হতে পারে।

ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের সরকারি প্রকাশন, Ancient India-য় প্রকাশিত (১৯৫৪-৫৫) লালের প্রতিবেদনটির মুখবন্ধে জরিপ বিভাগের তদানীন্তন প্রধান এ. ঘোষ লালের সিদ্ধান্তের জোরালো বিরোধিতা করেছিলেন। ‘হস্তিনাপুরের খননকার্যে মহাভারতের কাহিনীর সত্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে’- এমন ভাবনার বিষয়ে তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন। ঘোষের এই কথায় তার ভবিষ্যৎ দৃষ্টির প্রমাণ পাওয়া গেল এবং শীঘ্রই লালের সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গে নানান প্রশ্ন উঠল।

অচিরেই মর্টিমার হুইলার এবং ভি. এইচ. গর্ডনের মতো প্রত্নতাত্ত্বিকেরা রাশ-করা অবশেষের ভিত্তিতে লালের নির্ণীত সময়ের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেন। PGW-কে হুইলার খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দের আগে স্থান দিতে রাজী নন আর গর্ডনের মতে সেটি ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পরের সময়কার। কার্বন কাল-নির্ণয় যখন সহজে করা গেল তখনি এই অনুমানের সত্যতা প্রমাণিত হলো। হস্তিনাপুর থেকে সংগৃহীত PGW স্তরের আটটি নমুনা পেশ করা হলো এবং দেখা গেল যে, ত্রুটির শতাংশ হিসেব করেও এইসব কটি PGW স্তরের সময়কাল অনেক পরের, খ্রিস্টপূর্ব ৭৮৫ অব্দ থেকে ১৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে (পশ্চিমী উত্তরপ্রদেশ এবং পূর্ব রাজস্থানের PGW স্তরের সময়কাল সাধারণভাবে খ্রিস্টপূর্ব ৭০০-৪০০ অব্দ হিসেবে প্রস্তাবিত হয়েছে)।

এই সমস্ত প্রমাণ যেখানে মহাভারতের সম্ভাব্য অসংশ্লিষ্টতা প্রকাশ পেয়েছে, তার বিরোধিতায় লাল এবং তার সমর্থকের দল ‘কার্বন তারিখ নির্ণয় পদ্ধতির বিভিন্ন ভিত্তির (দূষিত নমুনা, স্ববিরোধি প্রকৃতি ইত্যাদি)’ বিরুদ্ধে নানান প্রশ্ন তুলতে শুরু করলেন এবং আত্রাঞ্জিখেরায় পাওয়া খ্রিস্টপূর্ব ১২৬৫-১০০০ অব্দের একমাত্র বিচ্ছিন্ন সময়কালটির কথা বলতে লাগলেন। কিন্তু ওই একই স্থান থেকে একই স্তরের ২০- ৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের একটি সময়কালও পাওয়া গেছে। আত্রাঞ্জিখেরায় PGW-পর্বের আগে কালো এবং লাল সামগ্রী (BRW)-র একটি পর্ব ছিল, কার্বন কাল নির্ণয়ে যেটি খ্রিস্টপূর্ব ৮১৫-৪১০ অব্দের, কাজেই সেখানকার PGW-র অবস্থান অত্যন্ত অনিশ্চিত।

প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের ভগওয়ানপুরের খননকার্যে কার্বনকাল নির্ণয় পদ্ধতিকে বাদ দিয়ে আনা হলো তাপোজ্জ্বলন পদ্ধতি। কিন্তু এতেও ভাল কোনো ফল পাওয়া গেল না। PGW মৃৎশিল্পের অসম্ভব সব তারিখ পাওয়া গেল খ্রিস্টপূর্ব ১৮৩৬ এবং ১৮৫২ অব্দ আর ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দ কিংবা ৭৩২ এবং ৬৭১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। খননকারি জে পি যোশী (লালের সমর্থকদের একজন যিনি জরিপ বিভাগের প্রধান হয়েছিলেন) কীভাবে এইসব তারিখ থেকে PGW স্তরটিকে (অন্তিম হরপ্পার ওপর এর পড়ে-থাকা চিহ্নে) ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে ‘খ্রিস্টপূর্ব ১৪৫০ থেকে ১০০০ অব্দ বা তার একটু আগের’ বলে চিহ্নিত করলেন সে রহস্যের মীমাংসা করা যায় না। দেখেশুনে এটাই মনে হয় যে, সাক্ষ্য প্রমাণ যাই থাকুক না কেন শেষপর্যন্ত পূর্ব নির্ধারিত মতবাদটিই তখন নিশ্চই জোরালো ছিল। এমনকি পরম্পরায় সংশ্লিষ্ট ওই একই বন্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও যোশী লালকে অনুসরণ করেছিলেন। ভগবানপুরায় দুটি বন্যার চিহ্ন পাওয়া গেছে, কাজেই ও দুটি নিশ্চয়ই শতপথ ব্রাহ্মণে উল্লিখিত বন্যা।

লোহার প্রসঙ্গও এখানে চলে আসে। আত্রাঞ্জিখেরার খননে PGW স্তরে প্রচুর লৌহসামগ্রী পাওয়া গিয়েছিল বলে এটা পরিস্কার বোঝা যায় যে, পশ্চিমী উত্তরপ্রদেশের PGW মোটেই প্রাক লৌহ নয়, সেটি লৌহ যুগের। সমগ্র হস্তিনাপুরের PGW স্তরে কোথাও লোহার সামগ্রী, যেটি যে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে একটি খুবই সদৃশ শিল্পসামগ্রী, তার একটি খণ্ডাংশও কেন পাওয়া গেল না- এ প্রশ্নটি খুবই মূল্যবান। প্রায়শই অযৌক্তিকভাবে PWG স্তরে লোহার উপস্থিতির প্রশ্নে হস্তিনাপুরের উল্লেখ করা হয় এবং আবার একইরকম যুক্তিহীনতায় PGW স্তরটিকে অনেক পূর্বের সময়কালের বলে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে অকারণে, একইরকম অযৌক্তিক ভাবনায় ভারতে লৌহ আগমন অনেক প্রাচীনকালের ঘটনা বলে দাবী করা হয়, কিন্তু এই প্রচেষ্টাগুলোকেকে কোনো কারণ বা যুক্তির আধারে বিচার করা যায়না।

একটি মহাভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব নির্মাণে নিজের প্রচেষ্টার এমনসব অসুবিধা সত্ত্বেও বি বি লাল ১৯৭০-এর দশকে আরেকটি মহাকাব্য রামায়ণের প্রতি তার মনোযোগ ন্যস্ত করলেন। মহাভারতের বর্ণনার মধ্যে যেহেতু রামায়ণের একটি কাহিনী রয়েছে, সে কারণে ওই কাব্যের ঘটনাবলীকে মহাভারতের যুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে স্থান দেওয়া হলো। দেখা গেল, লালের হিসেবে সেটি খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০ অব্দ। তিনি অযোধ্যা খনন করলেন, নানা স্থানে পরিখা খনন করলেন। তবু এমনকি কালো এবং লাল সামগ্রীর কোনো স্তরও তিনি আবিষ্কার হলো না। সবচেয়ে প্রাচীনকালের যে মৃৎশিল্প সেখানে পাওয়া গেল, সেগুলো উত্তুরে কালো পালিশ-করা সামগ্রী অর্থাৎ NBP জাতীয় সামগ্রী, যেগুলো কখনোই খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দের আগের সময়কালের হতে পারে না। খুব বেশি হলে দশটি কার্বন তারিখ পাওয়া গেছে, কিন্তু সবগুলোর সময়কালই খ্রিস্টপূর্ব ৬২৫ অব্দ থেকে ২২৫ খ্রিস্টাব্দ। আর NBP সামগ্রীর ক্ষেত্রে এর সর্বোচ্চ সীমা খ্রিস্টপূর্ব ৩৯০ অব্দের চেয়ে বেশি নয়। স্পষ্টত অযোধ্যায় গৌতম বুদ্ধের সময়কালের আগেকার কোনো ধ্বংসাবশেষ নেই, যার সাহায্যে মহাভারতের যুদ্ধের সময়সীমা নির্ধারিত করার কথা বলা চলে। রামায়ণের যুগটি যে মহাভারতের পূর্ববর্তী তার কোনো প্রাসঙ্গিক ভিত্তিও এখানে পাওয়া যায় না।

ভারতবর্ষের প্রত্নতত্ত্বে মৃৎপাত্র

মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহৃত দ্রব্যাদির মধ্যে মৃৎপাত্রের কথাই সবার আগে আসে। তবে মানুষ ঠিক কখন এগুলোর ব্যবহার শুরু করেছিল তা নিশ্চিত করে জানা যায় না। অবশ্য উপমহাদেশের বেশ কয়টি প্রাগৈতিহাসিক যুগীয় প্রত্নস্থলে মধ্য পাথর পর্যায়ের ক্ষুদ্রাকার হাতিয়ারের সাথে অত্যন্ত ক্ষয়িষ্ণু মৃৎপাত্রের খোলামকুচি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে আজ অবধি যদিও মধ্য পাথর পর্যায়ের কোন নিদর্শন আবিষ্কৃত হয় নি তথাপি কুমিল্লার লালমাই ময়নামতি প্রত্নস্থলে প্রস্তরীভূত কাঠের তৈরি প্রাগৈতিহাসিক যুগীয় হাতিয়ারের সাথে কিছু খোলামকুচির সন্ধান পাওয়া গেছে। কিন্তু এগুলোর প্রকৃতি নির্ণয় করার মতো কোন উল্লেখযোগ্য ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট প্রত্নতত্ত্বকর্মীর নিকট থেকে অদ্যাবধি পাওয়া যায় নি। অন্যদিকে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক যুগীয় প্রত্নস্থলগুলো থেকে প্রচুর মৃৎপাত্র ও খোলামকুচি আবিষ্কৃত হয়েছে।

মৃৎপাত্র আলোচনার প্রাথমিক শর্ত ওয়্যার (ware) নির্ধারণ। এ উপমহাদেশে এ যাবৎ একাধিক নমুনার ওয়্যারের সন্ধ্যান পাওয়া গেছে। এসবের মধ্যে হরপ্পা ওয়্যার, কালো ও লাল ওয়্যার, লাল ঔজ্জল্যময় ওয়্যার, পিঙ্গল রং-এর মৃৎপাত্র (OCP), জরওয়ে ওয়্যার, মালয় ওয়্যার, চিত্রিত ধূসর ওয়্যার (PGW) ও উত্তরদেশীয় কালো পালিশকৃত ওয়্যার (NBP) এবং দগ্ধপূর্ব কালো প্রলেপযুক্ত ওয়্যার বহুল আলোচিত। এগুলোর সাধারণ পরিচিতিমূলক সংক্ষিপ্ত বিবরণ –

  • হরপ্পা ওয়্যার (আ. খ্রি.পূ. ২১৫০-১৮৫০): সাথি-প্রত্নবস্তু হিসেবে পাওয়া যায় দগ্ধ অথবা অদগ্ধ ইটে তৈরি ইমারত, নালা, পয়ঃপ্রণালি, রাস্তা ও শৌচাগার সমেত নগরায়ন, ভাবলিপি সংবলিত সীলমোহর ও সীলছাপ, তামা ও ব্রোঞ্জ নির্মিত দ্রব্যাদি, হাতির দাঁত, হরিণের শিং, শঙ্খ, খড়িপাথর, অঙ্গারপাথর, অলঙ্কার ও ত্রিকোণাকার অদপ্ত মাটির পিষ্টক ইত্যাদি।
  • লাল ঔজ্জ্বল্যময় ওয়্যার (আ. খ্রি.পূ. ১৮০০- ১২০০): সাথি-প্রত্নবস্তু হিসেবে পাওয়া যায় উচ্চ-হরপ্পা সভ্যতার সকল নিদর্শন ও হাড়ের তৈরি প্রত্নবস্তু।
  • পিঙ্গল বর্ণের মৃৎপাত্র (আ. খ্রি.পূ. ১৬০০- ১৩০০): সাথি-প্রত্নবস্তু হিসেবে পাওয়া যায় তামা পর্যায়ের প্রায় সব প্রত্ননিদর্শন ও হাড়ে তৈরি প্রত্নবস্তু। তবে এ পর্যায়ে স্থাপত্যিক অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি।
  • জরওয়ে ওয়্যার (আ. খ্রি.পূ. ১৬০০-১৩০০):
  • মালয় ওয়্যার (আ. খ্রি.পূ. ১৭০০-১৪০০):
  • চিত্রিত ধূসর ওয়‍্যার (আ. খ্রি.পৃ. ১০০০-৭০০): সাথি-প্রত্নবস্তু হিসেবে পাওয়া যায় চওড়া মাটির প্রাচীর (নগরায়ণের পুনঃ আবির্ভাব) ও লোহার পিণ্ড।
  • উত্তরদেশীয় কালো পালিশকৃত ওয়্যার (আ. খ্রি.পৃ. ৬০০ থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ): সাথি-প্রত্নবস্তু হিসেবে পাওয়া যায় ছাপাঙ্কিত মুদ্রা, লিপিবিহীন ছাঁচে ঢালাই মুদ্রা, লোহা নির্মিত প্রত্নবস্তু ইত্যাদি। এ পর্বে নগরায়ণ পুনরুজ্জীবিত হয় ও রাজতন্ত্র বিকাশ লাভ করে। এছাড়া স্থাপত্যিক কার্যাদিতে শৈল্পিক চেতনার স্ফুরণ শুরু হয়। এই ওয়্যারটি চলতি শতকের প্রথম অর্ধাংশ পর্যন্ত কেবল উত্তর ভারতীয় অঞ্চলসমূহের প্রত্নস্থলগুলোতে আবিষ্কৃত হয়েছিল। তাই তৎকালে এ নামেই এর পরিচিতি ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে এটি দাক্ষিণাত্য, মধ্যপ্রদেশ এবং পূর্বাঞ্চলেও প্রচুর পরিমাণে আবিষ্কৃত হয়েছে। সুতরাং বর্তমান প্রত্নচর্চার অঙ্গনে এ নামটি ব্যবহারের প্রসঙ্গে নতুন চিন্তা-চেতনা সূচিত হচ্ছে। বাংলাদেশে একমাত্র মহাস্থানগড় এবং ওয়ারিবটেশ্বরে আদর্শ উত্তরদেশীয় কালো পালিশকৃত ওয়্যারের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ ওয়্যার আদি ঐতিহাসিক পর্যায়ের সূচনালগ্নের স্মৃতির ধারক। মৌর্য শাসনামলে এটা উৎকর্ষতার চরম শিখরে পৌঁছেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এ যাবৎ এ ওয়্যারের নিদর্শনাদি স্তর বিন্যাসের মূল অবস্থা থেকে এর সাথি-প্রত্নবস্তুর সাথে অনাবৃত হয় নি।
  • কালো ও লাল ওয়্যার (আ. খ্রি.পূ. ২২০০ থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ): সাথি-প্রত্নবস্তু হিসেবে পাওয়া যায় পুরা ঐতিহাসিক যুগের তামা পর্যায় ও আদি ঐতিহাসিক পর্যায়ের লোহা পর্বের সকল নিদর্শন।
  • দগ্ধপূর্ব কালো প্রলেপযুক্ত ওয়্যার (আ. খ্রি.পূ. চার থেকে খ্রিস্টীয় সাত-আট শতক): সাথি-প্রত্নবস্তু হিসেবে পাওয়া যায় আদি ঐতিহাসিক পর্যায়ের সকল নিদর্শন।

১৫০০-৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইন্দো-আর্য এলাকার প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতিসমূহ

ভূমিকা

খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ নাগাদ, কোনো এক স্থানে ঋগ্বেদের প্রথম সাহিত্য রচনার সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষের লিখিত ইতিহাসের সূচনা হয়। বৈদিক রচনাগুলো যেসব তথ্য দেয়, তার থেকে প্রায় আটশ বছর আগের (আনু. খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-৭০০) ইন্দো-আর্য মানুষজনের পার্থিব জীবন এবং সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা পুনর্নির্মাণ করতে পারি। তখন লেখন রীতি ব্যবহৃত হতো না। রচনাগুলো স্মৃতিতে সঞ্চিত থাকত এবং কথনের মাধ্যমে এক থেকে অপরে সংবাহিত হতো। সত্যি যদি এরকমই ঘটে থাকে তবে প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষের মধ্যে কোনো শিলালিপির প্রত্যাশা করা যায় না। অথচ সাধারণভাবে এমন কিছু প্রামাণ্য উপায়ের নিরিখে কোনো ঐতিহাসিক সময়ের প্রত্নতত্ত্ব সঠিক ইতিহাসের চাবিকাঠির সন্ধান পায়। এ প্রসঙ্গে ইরানের সঙ্গে ভারতবর্ষের কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে, সেখানেও ওই একই সময়কালে আবেস্তা পাওয়া যায় যা একইভাবে প্রাথমিকভাবে কথনে সংবাহিত, যদিও কোথাও শব্দের কোনো লিখিত রূপের সন্ধান মেলেনি।

উৎসর্গ-বেদীর চতুর্দিকে এমন কোনো মন্দির বা মূর্তির উল্লেখ বৈদিক রচনায় পাওয়া যায় না, যাকে ধর্মীয় উপাসনার স্থান বলা যায়। এদের অনুপস্থিতিই প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের কাজকে আরো জটিল করে তোলে। কেননা কোথাও এমন কোনো প্রতিমা বা চিহ্ন পাওয়া যায় না যার সাহায্যে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলকে আর্য বসতি হিসেবে সনাক্ত করা যায়। এমনকি উৎসর্গ-বেদীগুলোও অস্থায়ী কাঠামো ছিল বলে মনে হয় এবং বসতি অঞ্চল থেকে সেগুলো দূরে নির্মাণ করা হতো। এমন অবস্থায় ঐতিহাসিক সংস্কৃতির সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক ‘সংস্কৃতি’ বা আর্কিওলজিকাল কালচারের মেলবন্ধন খুব কঠিন। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোকে তাত্ত্বিকভাবে সদৃশ শিল্পদ্রব্যের সম্মিলনীর (গর্ডন চাইল্ড প্রণীত) ভিত্তিতে বিভিন্ন আনুটাগরিতে ভাগ করার প্রয়োজন হয়। এ প্রসঙ্গে কোনো বিশেষ ধরনের মৃৎশিল্পকে স্বতন্ত্র ‘সংস্কৃতি’ বা আর্কিওলজিকাল কালচারের চিহ্ন হিসাবে নির্বাচন করাই সাধারণ রীতি। সংস্কৃতির ক্রমবিন্যাস এবং কালপঞ্জী স্থির করতে এই পদ্ধতি কিছুটা সাহায্য করে। কিন্তু একটা প্রশ্ন সবসময়ে রয়ে যায় যে, মৃৎশিল্পের একটি বিশেষ শৈলী বা কৌশল কখনো কি দুটি সংস্কৃতি (শিল্পদ্রব্যের বিভিন্ন ধরনের সম্মিলনে) একই সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে না। কিংবা কোনো একটি সংস্কৃতি কি (অর্থাৎ ভাষা, ধর্ম এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিরিখে একক) তার বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্নভাবে মৃৎশিল্প তৈরি করতে বা তার রূপ দিতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগে যেমন যথোচিত গুরুত্বেই প্রস্তাবিত হয়েছিল যে, প্রাচীন ইন্দো- আর্যরা মৃৎশিল্পের একটিমাত্র শৈলীর সঙ্গে যুক্ত, সেটি হলো চিত্রিত ধূসর সামগ্রী বা পেইন্টেড গ্রে অয়ার (PGW), আজ হয়ত তেমনভাবে চিন্তা করা যায় না।

এসব সত্ত্বেও প্রত্নতত্ত্ব যেখানে আমাদের অপরিমেয় সাহায্য করে, তা হলো আমাদের তারিখবিহীন রচনাগুলোর জন্য একটা কালপঞ্জী নির্দেশিকা প্রতিষ্ঠিত করা। দেখা যায়, রচনাগুলোতে উল্লিখিত ভৌগোলিক অঞ্চলগুলোতে যে লোহার উল্লেখ রয়েছে, তার সময়কাল প্রত্নতত্ত্বে নথিভুক্ত লোহার আবির্ভাবের চূড়ান্ত সময়সীমার চেয়ে বেশি হতে পারে না। প্রত্নতত্ত্বে আরো ব্যাপকস্তরে এর সত্যতা প্রতিপন্ন হয়েছে। বৈদিক সাহিত্যে একটি অ-নাগরিক লিপিহীন সভ্যতার চিত্র পাওয়া যায়। প্রাচীন এবং পরবর্তী বৈদিক সময়ে যখন এরকম ঘটনার সন্ধান পাওয়া গেছে, তখন রচনাগুলোর প্রমাণ দৃঢ়ভাবে সমর্থিত হয়েছে।

আফগানিস্তানে হেলমন্দ সভ্যতা ধ্বংসের পর

চিরাচরিত রীতিতে বিন্যস্ত প্রকৃত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দেখা যায়, ভারতবর্ষের রচনাসূত্রগুলো থেকে যে সমস্ত তথ্য পাওয়া যায়, তাদের ক্ষেত্রে কতদূর পর্যন্ত সংশোধন বা সংযোজন প্রয়োজন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ সম্পর্কে ঋগ্বেদে যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। আর সেখানে উল্লিখিত নদী এবং জনগোষ্ঠীর নামে আফগানিস্তানের প্রাচীন বসতির পরম্পরাও সুরক্ষিত আছে। সেখানে একটি নদীর কথা পাওয়া যায় যার নাম সরস্বতী। এই সরস্বতী এবং আবেস্তীয় নদী হরখবৈতি অধুনা যার নাম আরঘানদাব-হেলমন্দ একই নদী। ঋগ্বেদের জনগোষ্ঠী সৃঞ্জয় সেইস্তানের আখমেদিয় নাম জনকের কথা (পারসিক ভাষায় জরঞ্জ, জরঙ্গ) স্মরণ করিয়ে দেয়। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২১০০ সময়কালে হেলমন্দ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবার পর দেড় সহস্রাব্দ সময় যাবৎ এই অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক রেখাচিত্র পুনর্নির্মাণ করা খুবই কঠিন। অবশ্য শহর-ই-শোকতা এবং মান্ডিগাক এই দুটির আকারই দ্রুত সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর অবশেষে যে তারা ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছিল। মান্ডিগাক পরিত্যক্ত হলেও পরে সেখানে আবার ছোট্ট নতুন জনবসতি গড়ে উঠেছিল। সেখানে খননকারীর দল দুটি পর্বের সন্ধান পেয়েছিল, মান্ডিগাক ষষ্ঠ এবং সপ্তম। দূর্ভাগ্যবশত এদের কোনোটিরই কাল নির্ণয় করা যায়নি। আপাতভাবে বলা যায়, প্রাচীনতর নগরদুটি ধ্বংস হয়ে যাবার পর দীর্ঘ সময় ধরে ‘নগরায়ন’ পর্বটি চলেছিল। মান্ডিগাকে ষষ্ঠ স্তরে যদিও লোহার সামগ্রী পাওয়া গেছে, কিন্তু আকারে সেগুলোকে একটি দীর্ঘ লৌহ ব্যবহারকারী জনবসতির উৎপন্ন বলেই মনে হয় এবং সেগুলো ১০০০ খ্রিস্টপূর্বের পরের সামগ্রী। আফগান সেইস্তানের নাদ আলিতে, যেখানে একটি ‘বিশালাকার স্তম্ভ’ রয়েছে, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে এগুলো সম্ভবত সেই নাগরিক জনবসতির উৎপন্ন। ওই একই জেলার গাদার-ই-শাহ-তে একটি লৌহযুগের প্রত্নস্থান রয়েছে। কিন্তু কেবলমাত্র গঠনশৈলীর নিরিখে একে যে অনেক প্রাচীনকালের বসতি (খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই ধারণাটি সম্ভবত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গান্ধার অঞ্চলে গান্ধার-সমাধি-সংস্কৃতি বা সোয়াট সংস্কৃতি

সিন্ধুর পশ্চিমতীরে প্রবাহিত নদীগুলোর মধ্যে ঋগ্বেদের নদী-স্তোত্রে শ্বেতা নদীর (কোথাও কোথাও সুভাস্তু নামে উল্লেখিত) উল্লেখ পাওয়া যায়। এটিকে সোয়াট নদী হিসেবে সনাক্ত করা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০-১৪০০ (ঘালিগাই, চতুর্থ) সময়কাল যাবৎ ওই সোয়াট উপত্যকায় একটি সংস্কৃতির দেখা মেলে। সেখানে অশ্বও গৃহপালিত ছিল এমন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে। কাজেই এই উপত্যকার মানুষজনদের সঙ্গে ইন্দো-ইরানীয় (আর্য)-দের যোগাযোগ থাকা সম্ভব। ঘালিগাই সংস্কৃতির চতুর্থ স্তরের পরবর্তীকালে অন্যান্য যে কটি দশা দেখা যায় যেগুলোকে ‘গান্ধার-সমাধি-সংস্কৃতি’র (Gandhara Grave Culture) প্রাচীনতর নিদর্শন বলে মনে করা হয়। কবরগুলো উন্মুক্ত করে সেখান থেকে নানান সামগ্রী পাবার পরেই এই সংস্কৃতির বা আর্কিওলজিকাল কালচারের প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়। বস্তুত, কবর থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রকৃতির সামগ্রী অনুসারে প্রথমে এর পর্বগুলোকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু বিভাজনের প্রশ্নে ঐকমত্য হয়নি। যেখানে  সমাধি ও ভগ্ন সমাধি পাওয়া গেছে সেখানে দাহ-করা অস্থি সমাধিস্থ করা খুবই প্রচলিত রীতি। কাতেলাই-তে ঘোড়ার জন্য দুটি পৃথক কবরস্থান পাওয়া গেছে। এখানে ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চলের একটি প্রচলিত রীতির অনুপ্রবেশ পাওয়া যাচ্ছে। সেইসঙ্গে মৃতদের কবর দেবার রীতিটি বিচার করলে, ঋগ্বেদের মানুষজনের সঙ্গে এর সম্ভাব্য সাংস্কৃতিক যোগাযোগের নিরিখে তথ্যগুলো অনেক বেশি তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে। সমস্ত পর্বেই তামার উপস্থিতি রয়েছে আর সম্ভবত বেশ অনেক আগেই আনু. ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই লোহার আবির্ভাব ঘটেছিল। কার্বন নির্ণীত কাল থেকে সাধারণভাবে এটি প্রস্তাবিত হয় যে, এই সংস্কৃতির প্রারম্ভকাল প্রায় ১৪০০ খ্রিস্টপূর্ব এবং এটি প্রায় ৪০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়কাল অবধি ব্যাপ্ত ছিল। অবশ্য লোহার বিক্ষিপ্ত অনুপ্রবেশ ছাড়া আর বিশেষ কোনো পার্থিব পরিবর্তন সংস্কৃতিতে ঘটেনি।

সোয়াট উপত্যকার মানুষজন তিন জাতীয় বার্লি, গম, ধান এবং মসূর (মসূরের বীজই সবচেয়ে বেশি), ও আঙুর উৎপাদন করত। আলিগ্রামে খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতাব্দীর সময়কালের লাঙল-কর্ষিত ক্ষেত্রটি থেকে বোঝা যায় তখন লাঙল ব্যবহৃত হতো। প্রাণীর অস্থি থেকে কুঁজওয়ালা গবাদি পশুর আভাস মেলে। আর ঘোড়া এবং উটের (ব্যাকট্রিয়া?) আবির্ভাবও দেখা যায়। বাড়িগুলো নুড়িপাথরে গঠিত ছিল। মৃৎসামগ্রী দ্রুততর চাকায় প্রস্তুত করা শুরু হওয়ায় সেগুলো আরো সূক্ষ্ম ও মসৃণ হয়ে ওঠে। ধূসর-কালো সামগ্রী ধূসর সামগ্রীতে পরিবর্তিত হয়ে গেল। কিন্তু সমাধিতে পাওয়া সামগ্রীতে তেমন বিশেষ সামাজিক বিভাজন চোখে পড়ে না এবং সেখানে শহর বা বিশাল কোনো কাঠামো ছিল না। পণ্যদ্রব্যের আমদানীকৃত উপাদানের মান ক্রমশ খারাপ হওয়ার ঘটনায় ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বৈদিক অঞ্চলটি আরো দূরতর গাঙ্গেয় উপত্যকায় সরে যাওয়ার সঙ্গে এই ঘটনার কোনো যোগাযোগ থাকা খুব সম্ভবপর।

তক্ষশিলার কাছে হাথিয়ালে পাওয়া সংস্কৃতির সঙ্গে গান্ধার-সমাধি সংস্কৃতির সাদৃশ্য পাওয়া যায়। গোমালের (ঋগ্বেদের গোমতী নদী) নামানুসারে চিহ্নিত আরেকটি ‘সমাধি-সংস্কৃতি’ও সনাক্ত করা গেছে। ওই নদীর ধারে এর প্রধান প্রত্নস্থান হলো হথালা আর গুমলা। এখানে সংস্কৃতির প্রাচীনতর দশায় দাহকার্যের একটি বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো। সমাধিস্থল এত গভীরে খনন করা হতো যাতে সেখানে আগুন জ্বালানো যায়। সেই আগুনে মৃতদেহ দাহ করা হতো। লোহার ব্যবহার শুরু হবার পরেই আপাতভাবে কবর দেবার সরলতম রীতি প্রচলিত হলো। কিন্তু এর কোনো নির্দিষ্ট সময়কাল পাওয়া যায়নি।

বেলুচিস্তান, সিন্ধু ও কাশ্মীরে প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতিসমূহ

বেলুচিস্তান : বোলান গিরিখাতের নিম্নাঞ্চলে আর একটু নরম মাটিতে ঋগ্বেদের ভালান নামের জনগোষ্ঠী বাস করত। সেখানে প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০০-১২০০ সময়কাল নাগাদ পিরাকে সমৃদ্ধতর একটি কৃষি-সংস্কৃতি (পিরাক-দ্বিতীয় দশা) বিকশিত হয়েছিল। পিরাকে এবং নিকটবর্তী সিব্রিতে, ধান এবং অন্যান্য ফসলের চাষ করা হতো এবং ঘোড়া আর ব্র্যাকট্রিয় উট (আনু.) খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সময়কালে পরিচিত ছিল। পূর্ববর্তী তামা এবং ব্রোঞ্জ দশার সমগ্র উপাদান এই দ্বিতীয় দশায় উপস্থিত ছিল, কিন্তু এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ লোহাও ছিল। তবে কার্বন নির্ণীত আরো প্রাচীন তারিখটি যদি মেনে নিলে লৌহদশার সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ১০০০-৭০০ পর্যন্ত ব্যাপ্ত ছিল।

সিন্ধু : মূল সিন্ধু অঞ্চলের বিষয়ে প্রায় কিছুই বলা যায় না। সিন্ধু সভ্যতার পরেপরেই ঝুকার সংস্কৃতি পাওয়া যায়। অবশ্য আরো একটু রহস্যে ঢাকা ঝঙ্কার সংস্কৃতি এর মাঝে একটু ছেদ এনেছিল। এর প্রধান নথিভুক্ত প্রত্নস্থানটি হলো চানহু-দারো। এর কোনো তারিখ যেহেতু পাওয়া যায়নি সে অর্থে এই সংস্কৃতি খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় এবং প্রথম শতাব্দীর পরবর্তীকালের হতে পারে। বস্তুত সিন্ধু অঞ্চল থেকে কিছুই জানা যায়না। তবে সাক্ষ্যপ্রমাণের অনুপস্থিতির পরও অনুমান করা যায়, ওই সময়কালে চোখে পড়ার মতো বিশাল কোনো জনবসতি সেখানে ছিল না। ঋগ্বেদের ঋষিদের সমুদ্র আরবসাগর হয়ে থাকলে সিন্ধুর মধ্য দিয়ে বৈদিক ভূখণ্ড এবং সমুদ্রতীরের মধ্যে নিশ্চয়ই যাতায়াত ছিল। অন্যদিকে, এমন কোনো জনগোষ্ঠী বা স্থানের উল্লেখ ঋগ্বেদে পাওয়া যায় না যেটি সিন্ধু অঞ্চলে অবস্থিত ছিল, কেবলমাত্র সিন্ধুর উল্লেখই পাওয়া যায়।

কাশ্মীর : ঋগ্বেদের নদী মারুবৃধা আর বর্তমানের মারু-ওয়ার্ধান একই নদী – এই সিদ্ধান্তটি সঠিক হলে ঋগ্বেদের মানুষজনের কাছে কাশ্মীর অপরিচিত ছিল এটা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। উত্তরের নব্যপ্রস্তর যুগ ‘কার্বন- কাল নির্ণয়ে আরো ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পিছিয়ে আসে’- এই প্রস্তাবনা উপেক্ষা করলে তবেই বলা যায় যে, কাশ্মীরে নব্যপ্রস্তর যুগ খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সময়কাল পর্যন্ত টিকে ছিল। এর পরবর্তী দশায় যেখানে একই ধরনের মৃৎশিল্পের ব্যবহার চালু ছিল, সেখানে আপাতদৃষ্টিতে ওই নব্যপ্রস্তরযুগীয় ধর্মবিশ্বাস প্রবর্তিত হয়েছিল। কেননা সেখানে পূজার শিলা (উপরদিকে প্রোথিত বিশাল অমসৃণ পাথর) পাওয়া গেছে, যদিও এর সঙ্গে কোনো কবরস্থান খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেখানে ধান, রাগি, জোয়ার উৎপন্ন হতো; তামা, লোহার ব্যবহারও শুরু হয়েছিল। কার্বন-নির্ণীত সময় পাওয়া না যাওয়ায় কেবলমাত্র বিক্ষিপ্তভাবে অনুমান করা যায়, বৃহৎ প্রস্তর দশাটি এর অনেক পরে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দ বা তারও পরে শুরু হয়েছিল।

পাঞ্জাবে H-সমাধিস্থল সংস্কৃতি বা অন্তিম হরপ্পা সংস্কৃতি

ঋগ্বেদের কেন্দ্রীয় অঞ্চল সপ্তসিন্ধুর দেশ (সপ্ত সিন্ধবা) বা পাঞ্জাবে সিন্ধু সভ্যতার পরবর্তীতে H-সমাধিস্থল সংস্কৃতি (Cemetery H culture) । হরপ্পায় H-সমাধিস্থলের প্রত্নস্থানগুলোতে পেশা এবং সেই সঙ্গে মৃৎশিল্প পরস্পরায় একটা ছেদ পড়েছিল। H-সমাধিস্থলের সমাধিস্থ করার প্রথার থেকেও এটি আলাদা। H-সমাধিস্থলের মধ্যবর্তী পর্যায়ে মৃতদেহ সৎকারের পদ্ধতি আবার পরিবর্তিত হয়েছিল এবং H-সমাধিস্থল ভগ্ন সমাধিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ মৃতদেহ তখন প্রথমদিকে উন্মুক্ত স্থানে রাখা হতো এমন আভাস পাওয়া যায়। মৃতদেহ ফেলে-যাওয়া (পরপ্তাহ) এবং উন্মুক্ত স্থানে সেটিকে রাখা (উদ্ধিতাহ) এই পদ্ধতিকে ঋগ্বেদে ‘অনগ্নিদগ্ধ’ অর্থাৎ অদাহকার্য বলা হয়েছে। অথর্ববেদে এর স্বীকৃতি মেলে। এই পরিবর্তনের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এই যে, খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সাল নাগাদ H-সমাধিস্থল অঞ্চলে বৈদিক আর্যদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।

পাকিস্তানের এলাকায় যেটিকে H-সমাধিস্থল সংস্কৃতি বলা হয়, ভারতে সেটিই অন্তিম হরপ্পা সংস্কৃতি (Late Harappan Culture) । কেবলমাত্র মৃৎশিল্পের ভিন্নধর্মিতার নিরিখে সংস্কৃতিকে সনাক্ত করার রীতির কারণেই নামকরণে এই ভিন্নতা। অথচ এই মৃৎশিল্পগুলো একই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। অতএব উভয় সংস্কৃতিকে ‘অন্তিম সিন্ধু’ নামে একই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সঙ্ঘোল এবং বানাওয়ালি থেকে পাওয়া কার্বন নির্ণীত সনতারিখ এবং ভগওয়ানপুরের তাপোজ্জ্বলন প্রক্রিয়ার তারিখ, উভয় সময়কালের নিরিখেই অনুমান করা যায় যে, এই সভ্যতা ১০০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তারপর ভগওয়ানপুরে এর ওপর চিত্রিত ধূসর সামগ্রীর চিহ্ন চোখে পড়ে এবং সেটিও আনুমানিক ৭০০ খ্রিস্টপূর্ব অবধি টিকে ছিল। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ছাড়া পাঞ্জাবের সমগ্র প্রদেশ, হরিয়ানা এবং গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলের উপরের অংশ এই বিস্তীর্ণ এলাকায় অন্তিম সিন্ধু সংস্কৃতি পরিব্যাপ্ত ছিল। কাজেই দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ঋগ্বেদের এলাকার সঙ্গেই এর সীমান্তরেখাটির বেশ সাদৃশ্য রয়েছে।

সিন্ধু সভ্যতার বসতি অঞ্চলের তুলনায় নিম্ন হাক্রা-ঘগ্গর অববাহিকায় গড়ে-ওঠা অন্তিম-সিন্ধু-বসতির ঘনত্ব অনেক কম ছিল। বাহাওয়ালপুর জেলায় (পাকিস্তান) পরিণত সিন্ধু বসতির সংখ্যা ছিল ১৭৪টি, সেখানে অন্তিম-সিন্ধু সভ্যতায় ৫০টি এবং ঠিক পরবর্তী চিত্রিত ধূসর সামগ্রী সংস্কৃতিতে (Painted Gray Ware (PGW)) মাত্র ১৪টি জনবসতি পাওয়া যায়। অন্যদিকে হরিয়ানায় সিন্ধু এলাকা ১২০টি, অন্তিম সিন্ধু ৬১৮টি এবং PGW এলাকা ৬১৫টি। স্পষ্টত, শতদ্রু-যমুনা বিভাজিকায় অবস্থিত নদীগুলোর নিম্ন প্রবাহে যখন জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে, তখন এর উপরের অববাহিকায় তার পরিমাণ বাড়ছে। কৃষিকাজ যখন উপরের স্রোত থেকে অধিক পরিমাণে জল তুলে নিল, তখন ছৌতং এবং ঘগ্গর যে দুটি প্রধান নদীর জলে হাক্রা পুষ্ট হতো, সে নদীগুলোর নিম্নধারা পর্যন্ত জল আর যথেষ্ট পরিমাণে পৌঁছোতে পারল না। এই ঘটনায় নিম্ন অববাহিকা অঞ্চলের বসতি এলাকা ক্রমাগত পরিত্যক্ত ও জনবিরল হয়ে উঠতে লাগল।

গাঙ্গেয় অঞ্চলের কালো-লাল রঙের সামগ্রী সংস্কৃতি (BRG) ও চিত্রিত ধূসর সামগ্রী সংস্কৃতি (PGW)

অন্তিম সিন্ধু সংস্কৃতির সমসাময়িক কালে গাঙ্গেয় অববাহিকার বিভিন্ন স্থানে সঠিক দ্বিফসলী উৎপাদন চক্রের ভিত্তিতে কৃষিজীবী গোষ্ঠীর তাৎপর্যময় অনুপ্রবেশ ঘটল। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে উত্তর-প্রদেশের প্রত্নস্থান নরহন। নরহন এলাকাটিই ঘগ্গরের (শতপথ ব্রাহ্মণেরর সদানীরা) তীরে অবস্থিত। এর নিকটবর্তী অঞ্চলে আরো দুটি স্থান ছিল- খৈরাদি এবং সোহগৌরা। কার্বন নির্ণীত তারিখ অনুযায়ী এই সংস্কৃতির কাল স্থির করা হয়েছে আনু. ১৩০০-৭০০ খ্রিস্টপূর্ব। যে মৃৎশিল্পে এটিকে সনাক্ত করা যায়, সেটি হলো কালো এবং লাল রঙের সামগ্রী সংস্কৃতি (Black and Red Ware Culture) । কৃষকেরা বাস করত গাছের ডালপালার ওপর মাটির আস্তর দেওয়া বাড়িতে। তারা যব (তুষযুক্ত, ছয় সারির), গম (ক্লাব, রুটি এবং বামন) আর ধান উৎপাদন করত। এর সঙ্গে ছিল নানাধরনের ডাল, যেমন মুগ, ছোলা, কলাই এবং খেসারি আর সরিষা ও তিল তেলের বীজ। প্রচুর পরিমাণে কুঁজওয়ালা গবাদি পশুর অস্থি পাওয়া গেছে। কিন্তু ঘোড়াকে নিশ্চিতভাবে সনাক্ত করা যায়নি। গাড়ির চাকার কোনো প্রমাণ মেলেনি। আর গাড়ি বা লাঙল যাই হোক না কেন, কোনো কিছু টানার কাজে ষাঁড় ব্যবহৃত হতো এমন প্রমাণ নেই। আরও পূর্বদিকে, বিহারের চিরান্দ এবং পশ্চিমবাংলার মহিষাদলের মতো প্রাচীনতর তাম্রপ্রস্তর যুগের সভ্যতার প্রত্নস্থানগুলোতে যে কৃষিকাজের চিহ্ন পাওয়া যায়। সে সময় এদের মৃৎশিল্পেও সম্ভবত কালো-লাল সামগ্রীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল।

কালো এবং লাল সামগ্রী সংস্কৃতির কালপঞ্জী (অতি ব্যতিক্রমী তারিখগুলো বাদ দিয়ে)

অঙ্গরাজ্য প্রত্নস্থান সময়কাল (খ্রিস্টপূর্ব) বৈশিষ্ট্য
পশ্চিমবঙ্গ ভরতপুর ১৭৭০-৭৯৫
বিহার চিরান্দ ৮৮৫-৭৫০
উত্তরপ্রদেশ (পূব থেকে পশ্চিমে) খৈরাদি ১৩৫০-৮১০
সোহগৌরা ১৬৭০-১২২৫
নরহন ১৫০০-১২৭০
শৃঙ্গভেরপুর ৮৯৫-৫৯৫
আত্রাঞ্জিখেরা ৮১৫-৪১০ PGW-র উত্তরসূরী
বটেশ্বর ৭৯৫-৪২০ PGW-র উপস্থিতি সহ
রাজস্থান যোধপুর ৪২৫-১৮০ PGW-র উপস্থিতি সহ

সারণিটিতে দেখা যায় যে, কালো-লাল রঙের সামগ্রী (BRG) পূর্বের দূরদেশে তার মূল সময়কালের চেয়ে উত্তরপ্রদেশের মধ্য ও পশ্চিম অংশে এবং পূর্ব রাজস্থানে অনেক পরে ছড়িয়ে পড়েছিল। এখান থেকে অনুমান করা যায়, ১১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পরে আর্য বা আর্যায়িত জনগোষ্ঠী গাঙ্গেয় অববাহিকায় চলার পথে এই মৃৎশিল্প নির্মাণকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল এবং তাদের পরাজিত করে আরো পশ্চিমদিকে তাদের প্রাচীনতর বসতি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল, আর তাই এমন ঘটনা সম্ভব হয়েছিল। BRW-র পশ্চিমমুখী প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এতে প্রমাণ হয় চিত্রিত ধূসর সামগ্রী সংস্কৃতি (PGW) যে বিশিষ্টতার কারণে বিশেষ স্থানের দাবিদার হয়ে ওঠে, ইন্দো-আর্য মৃৎশিল্পে তেমন কোনো স্বতন্ত্র্য বিশিষ্টতা ছিল না। অন্তিম সিন্ধু ক্ষেত্রের অভ্যন্তরের PGW, ভগওয়ানপুরে (হরিয়ানা) এবং জলন্ধর জেলার দুটি প্রত্নস্থানের অন্তিম সিন্ধু মৃৎশিল্পে আপতিত হয়। অন্তিম সিন্ধু ক্ষেত্রের বাইরের সংস্কৃতিগুলো BRW- বৈশিষ্ট্যকে অনুসরণ করে কিংবা এর উপরে এসে পড়ে। পশ্চিমী উত্তরপ্রদেশ এবং পূর্ব রাজস্থান অঞ্চলে PGW ৮০০ খ্রিস্টপূর্বের সামান্য আগেকার। সেখানকার BRW-দশার তারিখ সারণিতে দেওয়া আছে। এই অঞ্চলের চিত্রিত ধূসর শিল্পপণ্যের (PGW) গুণাগুণ অত্যন্ত কঠোরভাবে বিচার করে এর কার্বন নির্ণীত যে সময়কালটি পাওয়া গেছে, তা হলো খ্রিস্টপূর্ব ৭০০-৪০০। বস্তুত এখানে পূর্ণ বিকশিত একটি লৌহ সংস্কৃতি ছিল, যেটিকে কোনোভাবেই অন্তিম বৈদিক যুগের সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। কেননা সেই যুগের বৈদিক রচনায় লোহা পরিচিত হলেও তখনো ছিল তামার রাজত্ব

চিত্র : খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-৭০০ অব্দে ভারতবর্ষের প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতিসমূহ

মহারাষ্ট্রে জোরউই সংস্কৃতি

মহারাষ্ট্রে মোটামুটি ১৪০০ খ্রিস্টপূর্ব নাগাদ মালওয়া সংস্কৃতির স্থান অধিকার করে জোরউই সংস্কৃতি। সেটি প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ পর্যন্ত বিকশিত হয়, তারপর ক্রমশ ক্ষয় পেতে থাকে। সমগ্র মহারাষ্ট্র জুড়ে এই সংস্কৃতির ২০০টি প্রত্নস্থান আবিষ্কৃত হয়েছে, যদিও বিদর্ভে এবং উপকূলবর্তী অঞ্চলে একটি প্রত্নস্থানও পাওয়া যায়নি। উত্তরের তাপি অববাহিকাতেই বসতির ঘনত্ব সর্বাধিক। জোরউই সংস্কৃতিতে কৃষিকাজ এবং জনসংখ্যার তাৎপর্যময় প্রসার লক্ষ্য করা যায়। লাঙলের ব্যবহার সম্ভবত এর অন্যতম একটি কারণ। অবশ্য এর কোনো প্রকৃত প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু শিলালিপিতে উৎকীর্ণ ষাঁড়ে টানা গাড়ির রেখাচিত্রের সাক্ষ্য অনুযায়ী কোনো কিছু টানার জন্য কুঁজওয়ালা ষাঁড় (জেবু) ব্যবহৃত হত – এটা স্বীকার করা যায়। প্রধান উৎপাদিত খাদ্যশস্য যব, তবে গমও উৎপন্ন হতো। নতুন আবির্ভাবেই ধান তখন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভুট্টার মধ্যে জোয়ার এবং রাগি এই দু’ধরনের বীজ পাওয়া যায়। এর মধ্যে বাজরাও (হয়ত বা) ছিল। উৎপাদিত দানাশস্যের মধ্যে ছিল কুলখ কলাই, হায়াসিস্থ বিন, মসূর, শুঁটি, ঘাস-শুঁটি এবং সবজে ছোলা (উর্দু)। কার্পাসের প্রমাণও পাওয়া গেছে। গৃহপালিত পশুদের মধ্যে ষাঁড় এবং ছাগল-ভেড়াই প্রধান ছিল এবং খাদ্যের একাংশে থাকত এদের মাংস। জোরউই যুগে দাক্ষিণাত্যের ইনামগাঁও-তে সর্বপ্রথম ঘোড়ার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

লালের ওপর কালো রঙে চিত্রিত মৃৎশিল্প এই সংস্কৃতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। দ্রুত ঘূর্ণমান চাকায় এগুলো তৈরি করা হতো এবং এর কিছু নির্দিষ্ট আকার চোখে পড়ে যেমন, রঙিন (গোলাপী রঙের) বয়াম, ছিদ্রযুক্ত বয়াম আর উঁচু গলাওয়ালা গোলাকার পাত্র। তামা বিগলনের মান তখনো পুরোপুরি আদিম আর লোহার চিহ্নমাত্র নেই। যথেষ্ট সংখ্যায় পাথুরে হাতিয়ার ব্যবহার করা হতো নেভাসায় একটি ‘পাথর কুঠারের কারখানা’ পাওয়া গেছে। নেভাসাতে একটি রেশমের (বন্য) সুতো এবং সুতীর আবরণী পাওয়া গেছে। এছাড়া চান্দোলিতে একটি শনের দড়ি পাওয়া গেছে। এই সমস্ত সুতো সম্ভবত কাপড় বোনার কাজে লাগতো।

ইনামগাঁও থেকে পাওয়া একটি বয়ামের ওপর খোদিত ষাঁড়ে টানা গাড়ির চিত্রে তখন গাড়ির ব্যবহারের দৃঢ় প্রমাণ মেলে। দৈমাবাদের ব্রোঞ্জ থেকে অনুমান অনুযায়ী এটি সিন্ধু সভ্যতার সামগ্রী হয়ে থাকলে দাক্ষিণাত্যে গাড়িও সিন্ধু সভ্যতার প্রভাবে এসেছিল একথা মেনে নিতে হয়। ঘটনাচক্রে, বয়ামের নকশায় কিংবা জোরউই সংস্কৃতির প্রত্নস্থানগুলোতে পাওয়া পোড়ামাটির খেলনা-চাকায় স্পোকের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়না। গাড়ি নিশ্চয়ই স্থানীয় বাণিজ্যের পরিমাণ অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাছাড়া অরভল্লিস থেকে তামা এবং কর্ণাটক থেকে সোনা আসত। কাজেই ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে কিছু বাণিজ্যিক লেনদেনের সম্ভাবনা থেকেই যায়।

এইসব উন্নতির ফলে কিছু বসতি আকারে ছোট্ট একটা গ্রামের চেয়ে অনেকটাই বড় হয়ে ওঠে। প্রায় তিরিশ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত দৈমাবাদের জনসংখ্যা ছিল অন্ততপক্ষে ৬০০০। এপযন্ত জ্ঞান অনুসারে এটাই ভারতবর্ষে সবচেয়ে বড় জনবসতি ছিল। সিন্ধুর শহরগুলোর তুলনায় অবশ্য একে তখনো ছোটো একটা শহর বলা যায়। তবে প্রকাশ আর ইনামগাঁ এর প্রত্যেকটিই পাঁচ হেক্টর ক্ষেত্র জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এখানে মানুষজন আয়তকার বাড়িতে বাস করত। প্রত্যেক বাড়ির চতুর্দিকে মাটির প্রাচীর ছিল। ডালপালায় নির্মিত মূল কাঠামোর ওপর মাটির আস্তর লাগানো হতো। প্রতিটি বাড়িতেই সংলগ্ন আঙিনা থাকতো, যেটি গবাদি পশুর খোঁয়াড় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া সেই আঙিনায় পশুর মাংস ঝলসাবার জন্য উন্মুক্ত চুল্লী রাখা হতো।

ইনামগাঁও-এর বহু কামরা সম্বলিত কাঠামোটিকে ‘প্রধানের বাড়ি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর নিকটস্থ একটি কাদামাটির কাঠামো ছিল ‘শস্যাগার’, যেখানে সম্ভবত প্রধানকে দেয় শস্যকর মজুত থাকতো। এই সামান্য কিছু প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ছাড়া অনুমানে আর বেশি এগিয়ে যাওয়া কঠিন। সাধারণত বাড়ির মেঝেতে ছড়ানো অবস্থায় মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হতো আর কলসাকার শবাধারে শিশুদের দেহ কবর দেওয়া হতো। মৃতের পায়ের পাতা গোড়ালি থেকে কেটে নেওয়া হতো, সম্ভবত যাতে তারা এই পারিবারিক বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র না যায় কিংবা প্রেতাত্মা হয়ে চারিদিকে ঘুরে না বেড়ায়। কাদামাটির প্রতিমূর্তিগুলোতে দুজন দেবীর কথা জানা যায়, একজনের মাথা রয়েছে আর অন্যজন মস্তকহীন। বস্তুত পুরুষ মূর্তি একেবারেই অনুপস্থিত।

জোরউই বসতির প্রধান স্থানগুলো ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পর ধ্বংস হতে শুরু করে। কেবলমাত্র ভিমা উপত্যকায় একটি অধঃপতিত অন্তিম জোরউই সংস্কৃতি (আনু. খ্রিস্টপূর্ব ১০০০-৭০০) কিছুদিন অব্যাহত ছিল। অকস্মাৎ জমি অনুর্বর হয়ে যাওয়ার কারণে এমন ঘটেছিল বলে মনে করা হয়। কিন্তু সে সময় সামগ্রিকভাবে সর্বত্রই অনুর্বরতা দেখা দেয়ার এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া বেশ কঠিন। সেক্ষেত্রে এর ফলে কেবল মহারাষ্ট্রেই যে কেন এমন বিধ্বংসী ফলাফল দেখা গেল অথচ অন্য এলাকায় তেমন কিছুই হলো না, তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

দক্ষিণ ভারতের নব্যপ্রস্তর যুগীয় এলাকায় জোরউই সংস্কৃতির প্রভাব

জোরউই সংস্কৃতির ধ্রুপদী যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-১০০০) দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা দক্ষিণ ভারতের নব্যপ্রস্তর এলাকার সঙ্গে এই সংস্কৃতির বেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযাগ ছিল। দক্ষিণ ভারতের ওই সংস্কৃতির ওপর জোরউই সংস্কৃতির অনেক প্রভাব চোখে পড়ে যেমন, তামার বহুল ব্যবহার, সেই সঙ্গে অনেক তাম্রসামগ্রী জোরউই সামগ্রীর আকারকে মনে করিয়ে দেয়; চাকে ঘোরানো পালিশ না করা চিত্রিত মৃৎশিল্প; শিশুদের কলসাকার শবাধারের মতো এমন অনেক রীতি রেওয়াজ। হালুরে পাওয়া (কর্ণাটক) অশ্বাস্থির সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ অব্দ। এটি ইনামগাঁও-এর বাড়ির ঘোড়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। হালুর এবং তার পার্শ্ববর্তী প্রত্নস্থান কোমারানাহাল্লিতে, কার্বন এবং তাপোজ্জ্বলন উভয় পদ্ধতিতে নির্ণীত তারিখে বোঝা যায় যে, ১০০০ খ্রিস্টপূর্ব নাগাদ এখানে লোহা এসে পৌঁছেছিল। জোরউই সংস্কৃতির এলাকাগুলোতে সোনা রপ্তানির সম্ভাব্যতা এ প্রসঙ্গে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে: স্বর্ণখনির কাজ হতো হাত্তিতে, কার্বন তারিখে এর সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৯০০-৭৪০ অব্দ। দক্ষিণ ভারতের সাংস্কৃতিক অঞ্চলের সবচেয়ে দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য হলো বিশাল বিশাল প্রস্তরখণ্ডের ব্যবহার।

প্রসঙ্গে আলোচনার আগে, একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত। যে অর্থে প্রাচীনপ্রস্তর, ক্ষুদ্রপ্রস্তর, নব্যপ্রস্তর বা তাম্রপ্রস্তর শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়, “বৃহৎ প্রস্তরখণ্ডের ধ্বংসাবশেষ” শব্দটির (আক্ষরিক অর্থে বৃহৎ পাথর) ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়। সেসব ক্ষেত্রে মূলত হাতিয়ারের শ্রেণীবিভাগে পর্বগুলো উল্লেখ করা হয়, কিন্তু ‘বৃহৎ-প্রস্তর’ বা মেগালিথ বলতে স্থায়ী প্রতীক কিংবা কোনো অঞ্চলের রক্ষাকর্তা হিসেবে মাটিতে বিশাল পাথরের চাঁই পুঁতে রাখার ধর্মীয় প্রথার উল্লেখ করা হয়। দক্ষিণ ভারতে এই পাথরগুলো কেবলমাত্র সমাধিস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। এদের মধ্যে আধ ডজনের বেশি খণ্ডের প্রধান রূপটি আলাদা করে চিহ্নিত করা গেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো মর্টিমার হুইলারের খননে উন্মোচিত ব্রহ্মাগিরি প্রস্তর শবাগার। এখানে বিশাল বিশাল অমসৃণ পাথরের চাঁই দিয়ে একটা বৃত্ত তৈরি করা হয়েছে আর অপেক্ষাকৃত পাতলা পাথরে গড়া হয়েছে শবাধার যার মধ্যে সমাধিস্থ মানুষটি এবং কিছু সমাধি-সামগ্রী রাখা আছে।

এই বিশাল পাথরের সমাধির সঙ্গে কিছু অর্থনৈতিক প্রয়োগও জড়িয়ে রয়েছে। এই বিশাল পাথরগুলো আনা, তাকে কেটে প্রস্তুত করা এবং সাজানোর কাজে অনেক শ্রমিক লাগতো। প্রতিটি খণ্ডের আকার এবং তাদের সংখ্যা সমাধিস্থ মানুষটির পদমর্যাদা, সম্পদ অথবা ক্ষমতা নির্দেশ করে, যা স্পষ্টভাবে স্তর-বিভাজিত একটি সমাজকে নির্দেশ করে। বৃহৎ পাথরের বেশিরভাগ অঞ্চলে সমাধি-সামগ্রীর মধ্যে লোহার জিনিস পাওয়া গেছে। লোহার হাতিয়ারে পাথরকাটা অপেক্ষাকৃত সহজ হয় এবং সস্তাও বটে। বৃহৎ পাথরের সংস্কৃতিতে অবশ্য প্রয়োজনীয় নিত্য ব্যবহার্যের মধ্যে লোহা ছিল না। আগুনে গরম করে কিংবা তামার হাতিয়ারের সাহায্যেও পাথর কাটা যায়।

বৃহৎ প্রস্তর সংস্কৃতির লৌহযুগটি কালের দীর্ঘ পরিসরে বিস্তৃত ছিল। এখানে এর অপেক্ষাকৃত প্রাচীন পর্বটি (প্রাক-খ্রিস্টপূর্ব ৭০০), হাল্লুর এবং পিকলিহালের সমাধিতে এবং ব্রহ্মগিরির সমাধি-গহ্বরে (কলসাকার শবাধার নয়) যার চিহ্ন পাওয়া যায়, কেবলমাত্র সেটিই এই লেখার পরিসরের ক্ষেত্রে বিচার্য। জোরউই সংস্কৃতির মতোই এইসব সমাধিতে একটি কালো- লাল এবং একটি অনুজ্জ্বল নকশা-কাটা পীতাভ-লাল সামগ্রী রয়েছে। লোহার সামগ্রীও সেখানে রয়েছে, কিন্তু পাথরের হাতিয়ার, বিশেষ করে কুঠারের ব্যবহার তখনো প্রচলিত। মৃৎপাত্রের ওপর বোনা কাপড়ের দুটি ছাপ কিছুটা আগ্রহ জাগায় বটে, কিন্তু সুতোর অবশেষ সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

দক্ষিণ ভারত থেকে বৃহৎ প্রস্তর যুগের সংস্কৃতি সাগর পেরিয়ে পৌঁছে শ্রীলঙ্কায় যায়। সেখানে তখনো পর্যন্ত নব্যপ্রস্তর যুগের মূল প্রোথিত হয়নি, যদিও বিক্ষিপ্তভাবে দুটো একটা মাটি-পাথরের কুঠারের কথা প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে। তাছাড়া এবং ৩০০০০ বছর আগে থেকেই সেখানে ক্ষুদ্র পাথরের কারখানা চালু রয়েছে। ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে বিদর্ভ বৃহৎ প্রস্তর সংস্কৃতি (খ্রিস্টপূর্ব ৮০০-৪০০)-এর নৈকুণ্ড এবং তাকালঘাটের কার্বন তারিখ নির্দিষ্ট প্রত্নস্থান সম্ভবত দক্ষিণ ভারতের প্রভাবেই দেখা দিয়েছিল। দক্ষিণ ভারতের ক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে এর মৃৎশিল্প এবং লোহার হাতিয়ারের গঠনশৈলীতে পরিস্কার সাদৃশ্য রয়েছে। অতএব অন্ধ্রের মধ্যে দিয়েই বৃহৎ প্রস্তর সংস্কৃতির এই রীতি-রেওয়াজ বিদর্ভে পৌঁছেছিল। এর অশ্ব-সমাধিস্থান এবং গহনা সবই অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক।

সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে দ্রাবিড়ীয় বাচনের প্রতিষ্ঠা প্রকৃতপক্ষে বৃহৎ প্রস্তর সংস্কৃতির রীতি-রেওয়াজের দ্রুত প্রসারের সংকেত বহন করে থাকতে পারে, যার ফলে দক্ষিণভারতে তাদের বিশ্বাস এবং প্রথা এভাবে সংবাহিত হওয়া সম্ভব হয়। সেক্ষেত্রে পরবর্তীকালের দ্রাবিড়ীয় ভাষাগুলোর থেকে পুনর্নির্মিত প্রত্ন-দ্রাবিড়ীয় ভাষায় সেই প্রাচীনকালের সংস্কৃতি প্রতিফলিত হবে এমন প্রত্যাশাও করা যায়। অত্যন্ত কঠিন ভাষাভিত্তিক বিশ্লেষণের সাহায্যে ভাঙ্গরস্থি কৃষ্ণমূর্তি এমন একটি প্রত্ন-দ্রাবিড়ীয় ভাষার পুনর্নির্মাণ করেছেন।

এই সংস্কৃতি অন্তত প্রাচীন লৌহ যুগের, যেহেতু লোহার (সির-উমপু) কথা তখন জানা হয়ে গেছে। প্রত্ন-দ্রাবিড়ীয় ভাষায় জোয়াল লাগানো লাঙল এবং লাঙলের ফাল সংক্রান্ত শব্দ আছে, কিন্তু গাড়ি বা চাকা (গাড়ির!) জাতীয় কোনো শব্দ নেই। গরু, মহিষ, শূকর, ছাগল এবং ভেড়া, এসব শব্দ রয়েছে কিন্তু ঘোড়ার পুনর্নির্মিত শব্দটি যথেষ্ট সন্দেহজনক। ধান এবং ভুট্টার চাষ হতো, সেই সঙ্গে উৎপাদিত হতো কার্পাস ও আখ, সুপারি, কালো মরিচ এবং এলাচ ছিল ‘দ্রাবিড়ীয়দের দেশজ’। সোনা, রূপা এবং বাট্টা শব্দ ছিল, কিন্তু কোথাও অর্থ শব্দটি ছিল না। একই শব্দে রাজা এবং দেবতা দুটিই বোঝাত। এ বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। রাজারা শহরে বাস করত, কর এবং খাজনা গ্রহণ করত এবং তাদের সেনা ছিল। অতএব যুদ্ধ নিশ্চয় বাঁধতো। দেবতাদের প্রতি বিশ্বাসে (বিশেষ কারোর নাম আলাদাভাবে উল্লিখিত নয়) মানুষজন তাদের ইচ্ছাপূরণের বাসনায় পশুবলি দিত। কোনো কোনো ঘটনায় ‘অশুচি’ (পুল) হতে দেখা যায়, বিশেষত নারীর রজোদর্শনের সময়। পৌরোহিত্য চিহ্নিত করার মতো কোনো শব্দ ছিল না বলে মনে হয়।

প্রত্নতত্ত্বে পাওয়া ছবিটির সাথে এই ভাষাভিত্তিক অনুমানের তেমন একটা আমূল পার্থক্য নেই। তবে এটি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের মধ্যবর্তী শূন্যস্থানটি পূরণ করতে সাহায্য করে। কিন্তু একটা কথা এক্ষেত্রে মনে রাখা উচিত যে, ভাষাতাত্ত্বিক পুনর্নির্মাণে যে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত করা হয়, তার ভিত্তিতে আলোচ্য বিষয়টির কোনো অস্তিত্বই ছিল না এমন কথা নিশ্চিতরূপে বলা যায় না। কেননা, খুবই পরিচিত কোনো বস্তুর নাম পরে কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে কিংবা অন্য ভাষা থেকে অন্য কোনো শব্দ নেওয়া হতে পারে।

বিভিন্ন সংস্কৃতির কালপঞ্জী

অঞ্চল নির্বাচিত সংস্কৃতিসমূহ সময়কাল (খ্রিস্টপূর্ব) (± ১০০ বছর ত্রুটি সহ)
সীমান্ত এলাকা গান্ধার সমাধিক্ষেত্র সংস্কৃতি ১৪০০ – ৪০০
পিরাক ব্রোঞ্জ সংস্কৃতি ১৮০০ – ১২০০
পিরাক লৌহ যুগ ১০০০ – ৭০০
শতদ্রু-যমুনা বিভাজিকা এবং উচ্চ গাঙ্গেয় অববাহিকা ‘অন্তিম হরপ্পা’ (অন্তিম সিন্ধু) ২০০০ – ১০০০
অন্তিম হরপ্পা – চিত্রিত ধূসর সামর্গীর আপতন (হরিয়ানা) ১০০০ – ৭০০
কালো এবং লাল সামগ্রীর পর্ব, পশ্চিমী উত্তরপ্রদেশ ৯০০ – ৭০০
চিত্রিত ধূসর সামগ্রী, পশ্চিমী উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থান ৮০০ – ৪০০
মধ্যে এবং পূর্ব গাঙ্গেয় অববাহিকা নরহন সংস্কৃতি ১৩০০ – ৭০০
চিরান্দ তাম্রপ্রস্তর ১৮০০ – ১১০০
পশ্চিমবাংলা : কালো এবং লাল সামগ্রী ১৭০০ – ৮০০
উপদ্বীপ অঞ্চল জোরউই সংস্কৃতি ১৪০০ – ১০০০
অন্তিম জোরউই সংস্কৃতি ১০০০ – ৭০০
বিদর্ভ বৃহৎ প্রস্তর সংস্কৃতি ৮০০ – ৪০০
দাক্ষিণাত্যের বৃহৎ প্রস্তর এবং লৌহযুগ : প্রারম্ভ, পূর্বে ১০০০

লোহার আগমন

লোহার ব্যবহারের উদ্ভব

লোহা এমন এক উপাদান এ ব্রহ্মাণ্ডে যার ভাণ্ডার অপর্যাপ্ত। পৃথিবী ছাড়াও অনেক নক্ষত্রে, সূর্যে এবং উল্কায় লোহা পাওয়া যায়। ওজনের হিসাবে ভূত্বকের পাঁচ শতাংশই লোহা। উল্কাপিণ্ডগুলোকে বাদ দিলে (উল্কার যে খণ্ডাংশ পৃথিবীর ওপর ভয়াবহ পতনের পরও টিকে থাকে) প্রকৃতিতে লোহা বিযুক্ত অবস্থায় খুব কমই পাওয়া যায়। অবশ্য পৃথিবীপৃষ্ঠে লোহার আকরিক বিপুল পরিমাণে ছড়ানো আছে। আকরিক থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পর ধাতুটি নমনীয় এবং একে হাতুড়ির সাহায্যে পাতলা পাতে পরিণত করা যায়। লোহার গলনাঙ্ক অনেক উচ্চ (১৫৩৫° সে.) এবং সবচেয়ে পরিচিত রূপে (ফেরাইট) এটি ৭০০° সেন্টিগ্রেডের নিম্ন তাপমাত্রায় স্থিতিশীল থাকে। লোহা বিগলনে এত অসুবিধা থাকার জন্যেই এর ব্যবহার প্রচলিত হতে এত বিলম্ব হয়েছিল। পৃথিবীর প্রায় বেশিরভাগ অঞ্চলেই তামা এবং ব্রোঞ্জ (তামা ও টিনের সংকর) সবার আগে মানুষের কাজে লেগেছে।

মোটামুটি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় লোহার যে রূপটি প্রকৃতিতে সহজলভ্য সেটি একমাত্র উল্কাপিণ্ডের মধ্যেই পাওয়া যায়। ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র এই উল্কাপিণ্ড মাটির গভীরে পোঁতা আছে। কাজেই তাকে উত্তপ্ত করে, হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়েই যে প্রাচীনতম লোহার সামগ্রী তৈরি করা হয়। এইসব সামগ্রীতে নিকেলের ভাগ অত্যন্ত বেশি থাকায় সহজেই এদের সনাক্ত করা যায়। এমনকি খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালের আগেও ইজিপ্টে এবং ইরাকে লৌহ সামগ্রীর যে প্রাচীনতম খণ্ডাংশ পাওয়া গেছে, সেগুলো সবই উল্কাপিণ্ড থেকে তৈরি।

ধাতু বিগলন শুরু হবার পর যে সমস্ত সোনা বা তামার আকরিকে লোহার যৌগ-উপাদান অনেক বেশি ছিল সেগুলো থেকে আকস্মিক কোনো ঘটনাচক্রে লোহা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। প্রথমোক্ত ধাতুগুলো গলিয়ে আকরিক থেকে বাইরে আনার সময় পড়ে-থাকা লোহার খণ্ডের সঙ্গে হয়ত এমন কিছু টুকরো ছিল যেগুলো একটু গড়ে- পিটে কোনো সামগ্রী বানানো যায়। সিন্ধু সভ্যতার আল্লাহডিনো ও লোথালে এবং কাশ্মীর নব্য প্রস্তর যুগের গুফক্রালে বিক্ষিপ্তভাবে পাওয়া এরকম ছোটো ছোটো লৌহসামগ্রী হয়ত এইরকম পড়ে-থাকা লোহা দিয়ে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এরকম লোহা এত কম পাওয়া যেত যে দামী ধাতু হিসেবে এর মূল্য অনেক বেশি ছিল। খ্রিস্টপূর্ব উনবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিম এশিয়ায় লোহা রূপার চেয়ে চল্লিশগুণ দামী ছিল। এগুলো দিয়ে ঘর সাজানো যেতে পারে কিন্তু এগুলো ব্যাপকভাবে শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী নয়। এমনকি আরো পরে ১৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তুতানখামেনের সমাধিতে রাখা কবচ, ছুরি এবং ষোলটি ছোটো ছোটো বাটালি সবই ছিল উল্কাপিণ্ডের লোহা থেকে তৈরি।

চুল্লীর তাপ যখন লোহার জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় পৌঁছতে পারল, তখন বিগলনের প্রকৃত সময় এসে উপস্থিত হলো। এভাবে তৈরি লোহার খণ্ড অনেক দিন আগেই আবিষ্কৃত হয়েছে। মাণ্ডিগাকের চতুর্থ স্তর থেকে (আফগানিস্তান) খ্রিস্টপূর্ব ২৩০০ সময়কালের দুটি ‘বিগলিত লোহার অলংকৃত বোতাম’ এসেছে। তখনো লোহাকে পুরোপুরি গলানো যায়নি। উত্তপ্ত করে হাতুড়ি পিটিয়ে অত্যন্ত শ্রমসাধ্য পদ্ধতিতে একে রূপ দিতে হয়। কিন্তু এত কিছু করার পরেও এর কাটা প্রান্তগুলো বেশিদিন টিকত না। এরকম ‘নরম লোহা’ উৎপাদন-খরচ কিংবা কার্যকারিতা কোনোদিক দিয়েই তামার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারত না। লোহার সঙ্গে কার্বনের মিল ঘটিয়ে (কার্বনায়ণ বা Carburization) এর উপরিতল ‘ইস্পাত-কঠিন’ করে তোলার দরকার ছিল। সেটা করতে গেলে, হাপরের সাহায্যে আগুনকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে চুল্লীর মধ্যে কেবলমাত্র লোহার দণ্ডের উপরিতলেই কার্বনের স্পর্শ লাগে। কাঠকয়লার চুল্লীতে নতুন-কাটা কাঠের অনুপ্রবেশে কার্বনায়ণ ত্বরান্বিত হতে পারে। আকস্মিকতা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই হয়ত মূল আবিষ্কারে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এর কলাকৌশল তখনো পর্যন্ত এত জটিল ছিল যে, লোহার পড়ে-থাকা অবশেষের ক্ষেত্রে যেমন হয়েছিল সেভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে প্রতিটি ব্যক্তি-কারিগরের পক্ষে আলাদাভাবে এই আবিষ্কারের জ্ঞান অর্জন করা খুবই কঠিন ছিল। কাজেই কোনো একটি উৎস থেকে এই জ্ঞান অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছিল, এই সম্ভাবনাই এক্ষেত্রে প্রবল।

একবার ‘ইস্পাত’-এ পরিণত করা সম্ভব হলেই তৎক্ষণাৎ লোহা শিল্প-ধাতু হয়ে উঠল। লৌহ-সামগ্রীর উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। তামা বা ব্রোঞ্জের সামগ্রীর তুলনায় যখন লৌহ সামগ্রী পরিমাণে অনেক বেশি তৈরি হলো, তখনি অর্থনীতিতে ‘লোহার আগমন’ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠল। লোহার অস্তিত্বের সঙ্গে সাধারণভাবে পরিচিত হওয়া আর কাটবার হাতিয়ার ও অস্ত্র হিসাবে এটির প্রয়োজনীয় উপাদান হয়ে ওঠা, এ দুই-এর মাঝে নিঃসন্দেহে সময়ের অনেকখানি ফাঁক ছিল।

লোহা সংক্রান্ত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ

উত্তর মেসোপটেমিয়ার মিত্তানি শাসক তুসরাত্তা (দশরথ) (আনু. খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০) যখন ইজিপ্টের ফারাও-এর জন্য লোহার পাত খচিত ছুরি তৈরি করিয়েছিলেন, তখনো পর্যন্ত উল্কাপিণ্ডই লোহার উৎস ছিল (নিকেল ৩.২৫ শতাংশ), কিন্তু ছুরির মধ্যে ০.৪১ শতাংশ কার্বন থাকায় মনে হয় সচেতনভাবেই এটিকে কার্বনায়ণ করা হয়েছিল। উত্তর প্যালেস্তাইন-এর মাউন্ট আদির-এ খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীর যে গাঁইতি পাওয়া গেছে তাতে কার্বনায়ণের আরো নিশ্চিত প্রমাণ মেলে। গাঁইতির লোহা যে কার্বনায়িত করা হয়েছিল সে বিষয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। এর পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় লোহার শিল্পদ্রব্যকে খুবই প্রচলিত হতে দেখা গেলো। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের হাসানলুর খ্রিস্টপূর্ব ১১০০-৮০০ সময়কালের স্তর থেকে লোহার ‘কয়েক হাজার অস্ত্রশস্ত্র’ উদ্ধার করে গেছে বলে জানা যায়।

আফগানিস্তানে অবস্থিত সেইস্তানের নাদ আলি লৌহ-যুগের একটি প্রত্নস্থান, কার্বন- তারিখ অনুযায়ী যার সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দের অল্প পরের। উত্তর আফগানিস্তানের টিল্লা তেপে প্রত্নস্থান থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। কার্বন-তারিখ অনুযায়ী এর ‘আদি লৌহ যুগ’ ছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০-৮০০ অব্দ। এখানে খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালের অনেক আগেই লোহা পৌঁছে গিয়েছিল বলে আনু. খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ তারিখটি সহজেই মেনে নেওয়া যায়।

ভারতবর্ষের সীমান্ত এলাকায়, সোয়াট উপত্যকার বিভিন্ন স্থান থেকে (North Western Frontier Province, NWFP) অনেক লৌহ সামগ্রী পাওয়া গেছে। গান্ধার সমাধিক্ষেত্র সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত এইসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে একটা বল্লমের ফলা, একটা হাতা, ঘোড়ার লাগাম আর পেরেকের একটা নকশা-কাটা টুকরো। লোএবান এর তৃতীয় দশার সাম্প্রতিক স্তরে একটা তীরের ফলা পাওয়া গেছে। এই যুগের কার্বন তারিখ অনুযায়ী (চূড়ান্ত সময়: খ্রিস্টপূর্ব ১৩৬৫) একে খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের পরে রাখা কঠিন।

তক্ষশিলার (পাঞ্জাব) নিকটে সরাইগোলাতে গোমাল সমাধিক্ষেত্র সংস্কৃতির অবশেষে লোহা পাওয়া গেছে। কিন্তু এর সময় নির্ণয় করা যায়নি। উত্তরপূর্বে বেলুচিস্তানের মুঘল গুণ্ডাইতে লোহার আগমনের কাল খ্রিস্টপূর্ব ১১০০ থেকে ৮০০ সময়সীমা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। দক্ষিণে বেলুচিস্তানের বোলান গিরিপথের নিকটবর্তী পিরাকের তৃতীয় যুগে লোহা পাওয়া গেছে। এর কার্বন তারিখ হলো খ্রিস্টপূর্ব ৯১৫-৭৭০ অব্দ। অবশ্য আর একটি ব্যতিক্রমী তারিখও আছে, সেটির সময়সীমা খ্রিস্টপূর্ব ১৪১০-১০২৫ অব্দ।

বস্তুত, পূর্ব পাঞ্জাব এবং হরিয়ানায় লোহার কোনো আদি প্রমাণ মেলেনি। ভগওয়ানপুরের অন্তিম সিন্ধুর (খ্রিস্টপূর্ব ১০০০-৭০০) ওপর চিত্রিত ধূসর সামগ্রী সংস্কৃতির আপতনের মধ্যেও লোহার খবর নেই। উত্তরপ্রদেশের দিকে এগিয়ে গেলে আত্রাঞ্জিখেরার লৌহ সমন্বিত চিত্রিত ধূসর সামগ্রীর সংস্কৃতি পাওয়া যায়। এর লোহা ব্যবহারের আদি সময়সীমা খ্রিস্টপূর্ব ১২৬৫-১০০০ অব্দ, কিন্তু এই তারিখটি মোটেই মেনে নেওয়া যায় না, কারণ সে স্থানের PGW সংস্কৃতির অন্যান্য সামগ্রীর সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৬৪০-৪০০ অব্দ। ওই স্থানের PGW কালপর্বটি যে খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সময়কালের পূর্বের হতে পারে না তার যথেষ্ট জোরালো ভিত্তি রয়েছে। অন্য একটি PGW প্রত্নস্থান নোহ্-তে ‘আদি লৌহ দশা’র কার্বন তারিখের সময়সীমা খ্রিস্টপূর্ব ৮৮৫- ৩৯০ অব্দ। তাই উচ্চ গাঙ্গেয় অববাহিকায় লোহা আসার সময়কাল কোনোমতেই খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দের পূর্বেকার হিসেবে স্থির করা যায় না। কেননা কার্বন পরীক্ষায় ত্রুটির যে অংশটুকু রয়েছে, সম্ভাব্য প্রাচীনতম তারিখ যদি তার মধ্যে পড়ে, তবে সেটিকে গ্রহণ করলে নিশ্চয় বিরাট ভুল হয়ে যাবে।

প্রাচীনতর সংস্কৃতিতে লোহার বিক্ষিপ্ত উপস্থিতি এবং এর প্রাচুর্যে লোহার হাতিয়ার বানানো সম্ভব হলে আত্রাঞ্জিখেরায় এই দুটি ঘটনার মধ্যে পার্থক্যের সুস্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়। আত্রাঞ্জিখেরার PGW অবশেষ তিনটি পর্বে বিভক্ত করা যায়। পর্বগুলোতে তামা এবং লোহা সামগ্রীর আপেক্ষিক বিন্যাস –

পর্ব আদি মধ্য অন্ত যোগফল
তামা ১৩ ২২
লোহা ৪৬ ৮১ ১৩৫

প্রতিটি পর্বে লোহার সামগ্রী পরিমাণে তামাকে অতিক্রম করে গেছে। তাই বলা যায়, উচ্চ গাঙ্গেয় অববাহিকায় খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সাল নাগাদ অথবা তার পূর্বে হাতিয়ার তৈরির উপাদান তামা থেকে লোহায় দিকবদল করেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ১০২২-৮২৬ সময়কালের মধ্যে এই সমতলে লোহা ব্যবহারের স্বপক্ষে উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ে অবস্থিত উলেনাই-এর লোহা-উত্তোলনের প্রমাণটি যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। এখানে উত্তোলিত লোহা নিচের সমতলে পরিবাহিত হত। তবে এটি আরো কিছুটা প্রাচীনকালের বলে মনে হয়।

আরো পূর্বদিকে নরহন-এর (উত্তরপ্রদেশের পূর্বদিকে) সমতলভূমিতে, এর BRW পর্বে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৯০০-৮০০ অব্দে দুটি লোহার খণ্ড পাওয়া গেছে। তাই এই অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীতে সম্ভবত লোহার ব্যবহার শুরু হয়েছিল। পূর্ব ভারত থেকে পাওয়া প্রাচীন লোহার অন্যান্য তারিখের সঙ্গে এর সাযুজ্য রয়েছে: চিরান্দ (বিহার), খ্রিস্টপূর্ব ৮৮৫-৭৭০; মহিষাদল (পশ্চিমবাংলা), খ্রিস্টপূর্ব ৮২০-৬৯০ এবং বারুডি (ঝাড়খণ্ড), ৮৭৫-৪১৫ (ব্যতিক্রমী আরো একটি প্রাচীন তারিখ বাদ দিয়ে)।

আহার (রাজস্থান)-এ লোহার উপস্থিতির আদি সময়কালটি খ্রিস্টপূর্ব চোদ্দ শতাব্দী হিসেবে দাবি করা হয়। কখনো কখনো এটিকে মেনেও নেওয়া হয়। খননকার্যেও এই সময় আরো এগিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ওই একই প্রামাণিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এরদোসী খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর কয়েকটি খোদিত শিলালিপির ছাপের উপর ভিত্তি করে আহরে পাওয়া তাম্রমুদ্রার সময়কালও আরো এক সহস্রাব্দ পিছিয়ে দেন। মধ্যপ্রদেশের নাগদা লৌহপর্বের তারিখ হলো খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০-৫০০ (শৈলীর ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্ধারিত) আর এখানের লৌহ সম্বলিত দ্বিতীয় পর্বটির কাল খ্রিস্টপূর্ব ৭৯৫-৫৯৫ অব্দের।

বিদর্ভের বৃহৎ প্রস্তর সংস্কৃতিতে ব্যাপক হারে লোহা ব্যবহৃত হতো। নইকুণ্ড আর তাকালঘাটের সময়সীমা খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ থেকে ৪০০ (কার্বন তারিখ) অব্দ। খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালের পর দুটি বা তিনটি শতাব্দী যাবৎ লোহার ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে উপরের সময়কালের আবারও সাযুজ্য পাওয়া যায়। মহারাষ্ট্রের অন্যান্য স্থান থেকে আপাতভাবে লোহা ব্যবহারের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

ভারতবর্ষের বেশিরভাগ অঞ্চলের তুলনায় সম্ভবত কর্ণাটকে লোহার ব্যবহার অনেক আগেই শুরু হয়েছিল, যা বেশ লক্ষণীয় বিষয়। অবশ্য এক্ষেত্রে সীমান্ত এলাকাগুলোকে বোধ হয় বাদ দিতে হবে। এর দ্বিতীয় পর্বে যেখানে লৌহসামগ্রী প্রথম দেখা যায়, সে সময়ে তুঙ্গভদ্রার তীরে অবস্থিত হাল্লুরের কার্বন নির্ণীত সময়সীমা দাঁড়ায় খ্রিস্টপূর্ব ১৩৮৫ থেকে ৮২৫ অব্দ। পার্শ্ববর্তী প্রত্নস্থান কোমারানাহাল্লির লোহা ব্যবহারকারী বৃহৎ প্রস্তর যুগটির তাপোজ্জ্বলনে নির্ণীত সময় দাঁড়ায় খ্রিস্টপূর্ব ১৪৪০ থেকে ৯৩০ অব্দ। তাই লোহার ব্যবহার শুরু হবার তারিখ যদি প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ বা তার আগের কোনো সময় ধরা হলে তা খুব একটা অযৌক্তিক হবে না। এরকম কোনো প্রাচীনতর সময়কালে উত্তর ভারত থেকে লোহার ব্যবহার এ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ধারণাটি নাকচ হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিম এশিয়ার মধ্যে কোন বাণিজ্যিক বা সাংস্কৃতিক যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া না যাওয়ায় দক্ষিণ ভারতে সরাসরি কোনো পরিবহন অসম্ভব। অবশ্য আগেরটির মতো একে একেবারে বাতিল করা যায় না। দক্ষিণ ভারতের নব্যপ্রস্তর সংস্কৃতিতে তামা-বিগলনের শিল্পই অত্যন্ত দুর্বল ছিল। কাজেই দক্ষিণ ভারতে একেবারে দেশজ পদ্ধতিতে লোহা গলানো এবং তার কার্বনায়ণ ঘটানোর প্রক্রিয়া বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা আরো কম। একটা বিষয়ই নিশ্চিত করে বলা যায় যে, লৌহ বিগলন একবার শিখে যাবার পরেই সমগ্র উপদ্বীপে বৃহৎ প্রস্তর সংস্কৃতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই জ্ঞান দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।

লোহার ব্যবহার (বৃহৎ প্রস্তরের সংস্কৃতির সঙ্গে একত্রে) সাগর অতিক্রম করে শ্রীলঙ্কায় চলে আসে। অনুরাধাপুরের কার্বন নির্ণীত তারিখে অনুমান করা যায় যে, সে স্থানের লৌহযুগ শুরুর সময়কালটি খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দ পর্যন্ত পিছিয়ে নেয়া যেতে পারে।

লোহার প্রসারের কালপঞ্জী

অঞ্চল ব্যাপক হারে লোহা-ব্যবহার শুরুর আনুমানিক তারিখ (খ্রিস্টপূর্বাব্দ) (± ১০০ বছর ত্রুটি সহ)
সীমান্ত এলাকা ১১০০
গাঙ্গেয় অববাহিকা ৭৫০
মধ্য ভারত ৭০০
বিদর্ভ ৭০০
দক্ষিণ ভারত ১০০০
শ্রীলঙ্কা ৮০০

চিত্র : প্রাচীন লৌহ প্রত্নস্থানসমূহতথ্যসূত্র

তথ্যসূত্র :

  • বৈদিক সভ্যতা ও লৌহ যুগের আগমন (ক্যা. ১৫০০-৭০০ খ্রিস্টপূর্ব), ইরফান হাবিব, বিজয় কুমার ঠাকুর, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, জানুয়ারি, ২০১৯
  • প্রত্নতত্ত্ব : উদ্ভব ও বিকাশ, মোঃ মোশারফ হোসেন, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২০১১
  • Agrawal, D. P. (1982). The Archaeology of India. London (Chapters 8 & 9)
  • Allchin, B., & Allchin, R. (1983). The Rise of Civilization in India and Pakistan. Cambridge/New Delhi (Chapters 9 & 10)
  • Allchin, B., & others. (1995). The Archaeology of Early South Asia: The Emergence of Cities and States. Cambridge (Chapter 5 by R. A. E. Coningham & Chapter 6 by G. Erdosy)
  • Chakrabarti, D. K. (1999). India: An Archaeological History. Oxford (Chapter 4)
  • Nautiyal, K. P. (1989). Protohistoric India. Delhi (Chapters 7 & 9)
  • Dani, A. H., & Masson, V. M. (Eds.). History of Civilization of Central Asia. (Chapter 17 by A. H. Dani). Paris: UNESCO.
  • Dhavalikar, M. K. (1988). The First Farmers of the Deccan. Pune
  • Krishnamurti, B. (2003). The Dravidian Languages. Cambridge (Pages 6-16)
  • Joshi, J. P. (1993). Excavation at Bhagwanpura. Delhi
  • Gaur, R. C. (1983). Excavation at Atranjikhera, Early Civilization of the Upper Ganga Basin. Delhi
  • Singh, P. (1994). Excavations at Narhan, 1984-89. Varanasi/Delhi
  • Banerjee, N. R. (1986). Nagda. New Delhi
  • Dhavalikar, M. K., Sankalia, D. H., & Ansari, Z. D. (1988). Excavations at Inamgaon, Vols. 1 & 2. [Publisher].
  • Sali, S. A. (1986). Diamabad. Delhi
  • Thakur, V. K. (1981). Social Dimensions of Technology: Iron in Early India. Delhi
  • Chakrabarti, D. K., & Lahiri, N. (1993-94). The Iron Age in India. Puratattva, (24).
  • Tripathi, V. (1990). Early Historic Archaeology and Radiocarbon Dating. Indian Historical Review, (14).
  • Bhan, S., Habib, I., & Thakran, R. C. In Shrimali, K. K. (Ed.), Reason and Archaeology.

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.




This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.