প্রথম প্লেগ মহামারি (৫৪১-৭৫০/৬৭ খ্রি.)

Table of Contents

ভূমিকা

প্রথম প্লেগ মহামারী (First Plague Pandemic) ছিল প্লেগের প্রথম ওল্ড ওয়ার্ল্ড, অর্থাৎ আফ্রিকা ও ইউরেশিয়ার মহামারী। উল্লেখ্য প্লেগ হলো একটি সংক্রামক রোগ যা Yersinia pestis নামক ব্যাক্টেরিয়ার কারণে ঘটে। একে প্রারম্ভিক মধ্যযুগীয় মহামারীও (Early Medieval Pandemic) বলে। এটি ৫৪১ সালে প্লেগ অফ জাস্টিনিয়ান বা জাস্টিনিয়ানের প্লেগের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবং ৭৫০ বা ৭৬৭ সাল বর্যন্ত এটি বর্তমান ছিল। ঐতিহাসিক রেকর্ড থেকে জাস্টিনিয়ানের প্লেগের পর প্লেগের কমপক্ষে পনের বা আঠারোটি প্লেগের প্রধান তরঙ্গ-কে চিহ্নিত করা হয়। এই মহামারীটি সবচেয়ে গুরুতরভাবে এবং বেশি মাত্রায় প্রভাবিত করেছিল ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকাকে, সেই সাথে এটি নিকট প্রাচ্য এবং উত্তর ইউরোপকেও সংক্রামিত করে। রোমান সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানের নামে এই প্লেগের প্রথম তরঙ্গ, অর্থাৎ জাস্টিনিয়ানের প্লেগ বা জাস্টিনিয়ানিক প্লেগের নামকরণ করা হয়। তবে জাস্টিনিয়ান বা জাস্টিনিয়ানিক প্লেগ দ্বারা অনেক সময় কেবল এই মহামারির প্রথম তরঙ্গটিকে না বুঝিয়ে সামগ্রিকভাবে ৫৪১ থেকে ৭৫০/৭৬৭ সাল পর্যন্ত চলা সকল তরঙ্গকেই বোঝায়, অর্থাৎ পুরো প্রথম প্লেগ মহামারিকেই বোঝানো হয়। এই মহামারীর প্রথম এবং শেষ প্রাদুর্ভাব দ্বারা সবচেয়ে বেশি পরিচিত। প্রথমটি হলো ৫৪১-৫৪৯  সালের জাস্টিনিয়ানিক প্লেগ, যাকে সমসাময়িক রোমান ঐতিহাসিক প্রোকোপিয়াস (Procopius) বর্ণনা করেছেন, এবং শেষেরটি হলো নেপলস এর ৮ম শতাব্দীর শেষের দিকের প্লেগ, যাকে নেপোলিটান ঐতিহাসিক জন দ্য ডিকন (John the Deacon) পরবর্তী শতাব্দীতে বর্ণনা করেছেন (এটি আরও পরের নেপলস প্লেগ থেকে আলাদা)। এই মহামারী এর সমসাময়িক অন্যান্য বিবরণগুলির মধ্যে রয়েছে ইভাগ্রিউস স্কলাস্টিকাস (Evagrius Scholasticus), ইফিসাসের জন (John of Ephesus), ট্যুরের গ্রেগরি (Gregory of Tours), পল দ্য ডিকন (Paul the Deacon), এবং থিওফেনস দ্য কনফেসর (Theophanes the Confessor) এর রচনাগুলো, যাদের বেশিরভাগই মনে করতেন, প্লেগ ছিল মানুষের অপকর্মের বিরুদ্ধে একটি ঐশ্বরিক শাস্তি।

ল্যাটিন এবং বাইজেন্টাইন গ্রীক গ্রন্থে যেখানে এই রোগকে একটি জেনেরিক পেস্টিলেন্স (প্রাচীন গ্রীক: λοιμός, romanized: loimós, লাতিন: plaga) হিসেবে দেখা হতো, সেখানে কেবল পরবর্তীতে আরবি লেখকগণ এই রোগকে ṭāʿūn হিসেবে প্রকাশ করত। কোন কোন ক্ষেত্রে ওয়াবা (wabāʾ) বলা হতো যা প্লেগ শব্দটির (‘plague’) জায়গায় ব্যবহৃত হতো। সিরিয়াক ভাষায় বুবোনিক প্লেগ ও বুবোস উভয়কেই sharʿāáá বলা হতো। ক্রোনিকল অফ শীর্তে (Chronicle of Seert) এই শব্দকে আরবি ṭāʿūn এর সাথে সমার্থক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে প্রায়ই সিরিয়াক লেখকরা কোন রোগের প্রাদুর্ভাবকে কেবল একটি মহামারী বা মৃত্যুর মাওতানা হিসেবে উল্লেখ করতেন, যা আরবি “ওয়াবা” (wabāʾ) এর সমতুল্য। স্যুডো-জাকারিয়াস রেক্টর এর হিস্টোরিয়া মিসেলানিয়াতে mawtānā d sharʿūṭā (টিউমারের প্লেগ) এর সম্মিলিত রূপ পাওয়া যায়। থমাস দ্য প্রেসবাইটার (Thomas the Presbyter) এর ৬৪০ সালের ক্রোনিকলে “প্রথম প্লেগ” (“first plague” বা mawtáná qadmaya) এর সময়কাল ছিল ৫৪২ বা ৫৪৩ সাল।

প্রথম প্লেগ মহামারির উৎপত্তিস্থল

এই প্লেগের উৎপত্তিস্থল নিয়ে পণ্ডিতমহল দুই ভাগে বিভক্ত। প্রাচীন ঐতিহাসিক ও ক্রোনিকলাররা এই প্লেগের উৎপত্তিস্থল ধরেছিলেন আফ্রিকা ও দক্ষিণ আরবকে, যা অনুসরণ করে বর্তমানের অনেক পণ্ডিতরাও তাই দাবি করেন। অন্যদিকে আধুনিক জেনেটিক গবেষণাসমূহের ফলাফলগুলোকে কেন্দ্র করে অন্য শিবিরের দাবিদারগণ দাবি করেন এর উৎপত্তি মধ্য এশিয়ায়।  

বেশ কয়েকটি উৎস প্রত্যয়িত করে যে, এই প্লেগের উৎপত্তি আফ্রিকায়। এডেসার জ্যাকবের (Jacob of Edessa, মৃত্যু ৭০৮ সাল) মতে এই “গ্রেট প্লেগ (mawtānā rabbā) শুরু হয় ৫৪১-৫৪২ খ্রিস্টাব্দে মিশর অঞ্চলের দক্ষিণে কুশ (নুবিয়া) অঞ্চলে। ইভাগ্রিউস স্কলাস্টিকাস (Evagrius Scholasticus, মৃত্যু ৫৯৪ খ্রি.) এবং স্যুডো-জাকারিয়াস রেক্টর (তার হিস্টোরিয়া মিসেলানিয়া গ্রন্থে) এই প্লেগের উৎপত্তি মিশরের সীমান্ত অঞ্চলে ইথিওপিয়ায় (Aethiopia (Nubia)) হয়েছিল বলে দাবি করেন। মাইকেল দ্য সিরিয়ান (Michael the Syrian) এফিসাসের জন (John of Ephesus, মৃত্যু ৫৯০) এর একটি লস্ট ক্রোনিকল বা হারিয়ে যাওয়া ক্রনিকলের ওপর নির্ভর করে বলেন, মিশরের এটি সীমান্ত অঞ্চলে কুশ ও হিমিয়ার (Himyar বা ইয়েমেন)-এ শুরু হয়।

৫৪৩ সালের একটি শিলালিপিতে উল্লেখ আছে, কিভাবে স্থানীয় সম্প্রদায়ে অসুস্থতা এবং মৃত্যু আঘাত করার পর হিমিয়ার এর ইথিওপিয়ান শাসক আব্রাহা মা’রিব (Abraha Maʾrib) বাঁধ মেরামত করেন। ক্রোনিকল অফ শির্তে (Chronicle of Seert) উল্লেখ আছে, এই মহামারী আকসুমকে (আল-হাবাশা) আঘাত করেছিল। প্রারম্ভিক আরবি উৎসে নুবিয়া এবং আবিসিনিয়াতে উল্লেখ আছে যে, সেই অঞ্চলগুলোতে প্লেগ স্থানীয় ছিল। এই মহামারির প্রথম তরঙ্গ জাস্টিনিয়ানিক প্লেগের ক্ষেত্রে বাইজেন্টাইন ঐতিহাসিক প্রকোপিয়াস ৫৪১ সালে মিশরের সুয়েজের নিকটবর্তী পেলুসিয়াম বন্দর থেকে প্রথম এই মহামারীর কথা জানান। প্লেগের ধ্বংসযজ্ঞের আরও দুটি প্রথম দিকের প্রতিবেদন ছিল সিরিয়াক গির্জার ইতিহাসবিদ ইফিসাসের জন এবং ইভাগ্রিউস স্কলাস্টিকাস, যিনি সেই সময় এন্টিওকের একটি শিশু ছিলেন এবং পরে গির্জার ইতিহাসবিদ হয়েছিলেন। সমসাময়িক সূত্র অনুসারে, কনস্টান্টিনোপলের প্রাদুর্ভাবটি মিশর থেকে আগত শস্যের জাহাজে সংক্রামিত ইঁদুর দ্বারা শহরে বাহিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়েছিল। শহরটির নাগরিকদের খাদ্যের জন্য, শহর এবং বহির্মুখী সম্প্রদায়গুলি প্রচুর পরিমাণে শস্য আমদানি করেছিল, যেগুলোর বেশিরভাগই আনা হয় মিশর থেকে। সরকার দ্বারা পরিচালিত বড় শস্যভাণ্ডার থেকে খাদ্য গ্রহণ করে মিশরের ইঁদুরের (এবং মাছি) সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। প্রোকোপিয়াসের (Procopius) সাক্ষ্য অনুসারে, প্লেগ নীল বদ্বীপ বা নাইল ডেল্টার পূর্বের পেলুসিয়ামে শুরু হয়, এবং আলেকজান্দ্রিয়াতে বিস্তার লাভ করে। এই তথ্য লোহিত সাগর অঞ্চল থেকে এর উৎপত্তি ও বিস্তারলাভের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, হতে পারে জাহাজবাহিত ইঁদুর থেকে এটি ছড়ায় যদি তখনও ক্যানাল অফ দ্য ফারাওস (Canal of the Pharaohs) খোলা থেকে থাকে।

এই প্লেগ ভারতবর্ষের সাথে বাণিজ্যিক সংযোগ থেকে বা নুবিয়া এবং আকসুম এর ক্রমবর্ধমান রোমান ধর্মীয় সংযোগগুলি থেকে উদ্ভূত হয়ে থাকতে পারে। ভারতবর্ষের সাথে একটি সংযোগকে কে কম সম্ভাব্য ধরা হয়, কারণ এই প্লেগ ভারতবর্শের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ থাকা পারস্য বা চীনে প্রবেশের পূর্বে রোমান সাম্রাজ্যে প্রবেশ করে। পিটার সারিসের (Peter Sarris) মতে এই প্রসঙ্গে ষষ্ঠ শতাব্দীর গোড়ার দিকের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে হিমিয়ার এবং পারস্য এর বিরুদ্ধে আকসুমাইট-রোমান জোট কাজ করছিল। তার মতে এটি আফ্রিকা থেকে বাইজেন্টিয়ামে প্লেগ এর সংক্রমণে তর্কসাপেক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করেছে।

বর্তমানের অনেক পণ্ডিতগণ এই মধ্যযুগীয় ঐতিহাসিক ও ক্রনিকলারদের সাথে তাল মিলিয়ে বলেন, জাস্টিনীয় প্লেগের সাথে জড়িত নির্দিষ্ট স্ট্রেইনটি সাবসাহারান-আফ্রিকায় উদ্ভূত হয়েছিল এবং পূর্ব আফ্রিকার আকসুম রাজ্যের বণিকদের দ্বারা প্লেগ ভূমধ্যসাগরে ছড়িয়ে পড়েছিল। উৎপত্তির এই বিন্দুটি মিশর থেকে ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের বাকি অংশে রোগের সাধারণ দক্ষিণ-উত্তর বিস্তারের সাথে আরও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি আরও ব্যাখ্যা করে যে কেন সাসানীয় পারস্য মধ্য এশিয়ার সাথে শক্তিশালী বাণিজ্য সংযোগ থাকা সত্ত্বেও সেখানে প্লেগের আক্রমণ ঘটে প্লেগের প্রাদুর্ভাবের মধ্যবর্তী সময়ে, শুরুতে নয়।

জাস্টিনিয়ানের প্লেগকে সাধারণত Yersinia pestis এর প্রথম ঐতিহাসিকভাবে রেকর্ড করা মহামারী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই উপসংহারটি রোগের ক্লিনিকাল প্রকাশের ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং সেই সময়ের প্রাচীন কবরের স্থানগুলিতে মানুষের দেহাবশেষ থেকে ওয়াই পেস্টিস ডিএনএ সনাক্তকরণের উপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আধুনিক ও প্রাচীন ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ডিএনএর জেনেটিক গবেষণায় দেখা গেছে যে জাস্টিনিয়ান প্লেগের উৎপত্তি ছিল মধ্য এশিয়ায়। একটি সম্পূর্ণ প্রজাতি হিসাবে Yersinia pestis এর সবচেয়ে বেসাল বা মূল স্তরের বিদ্যমান স্ট্রেনগুলি চীনের কিংহাইতে পাওয়া যায়। জার্মা

নিতে জাস্টিনিয়ান প্লেগের আক্রান্ত হয়েছিল এমন ব্যক্তির কঙ্কাল থেকে Yersinia pestis এর ডিএনএর নমুনাগুলোকে সংগ্রহ করা হয়। এগুলো নিয়ে গবেষণা করে পাওয়া গেছে যে বর্তমানে তিয়ান শান পর্বতমালায় পাওয়া আধুনিক স্ট্রেইনগুলি জাস্টিনিয়ান প্লেগ স্ট্রেইনের তুলনায় সবচেয়ে বেশি বেসাল, মানে সেটাকেই জাস্টিনিয়ান প্লেগের জীবাণুর স্ট্রেইনের পূর্বপুরুষ ধরা যায়। উপরন্তু, তিয়ান শানে পাওয়া একটি কঙ্কালকে প্রায় ১৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকের এবং “প্রারম্ভিক হুন” হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে Yersinia pestis এর ডিএনএ পাওয়া গেছে। দেখা গেছে এটি জাস্টিনিয়ান প্লেগ স্ট্রেইন জার্মান স্যাম্পলের যে তিয়ান শান বেসাল এন্সেস্টর আছে তার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এই আবিষ্কারটি নির্দেশ করে, শংনু (Xiongnu) এবং পরবর্তীতে হানদের মত ইউরেশীয় স্তেপ জুড়ে স্থানান্তরিত হতে থাকা যাযাবরদের বিস্তার মধ্য এশিয়ার উৎপত্তিস্থল থেকে পশ্চিম ইউরেশিয়ায় প্লেগ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছিল।

এর আগে পশ্চিম ও পূর্ব ইউরেশিয়া জুড়ে ৩০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কঙ্কালগুলোতে Yersinia pestis ডিএনএর নমুনা পাওয়া গেছে। ব্ল্যাক ডেথের জন্য দায়ী Yersinia pestis এর স্ট্রেইন যা বুবোনিক প্লেগের বিধ্বংসী মহামারী, তাকে জাস্টিনিয়ান প্লেগ স্ট্রেনের সরাসরি বংশধর বলে মনে হয় না। যাইহোক, জাস্টিনিয়ান প্লেগের বিস্তার সম্ভবত বিবর্তনীয় বিকিরণ বা ইভোল্যুশনারি রেডিয়েশনের কারণ হতে পারে যা বর্তমানে বিদ্যমান 0ANT.1 ক্লেইড স্ট্রেইনগুলোর জন্ম দিয়েছে।

ভাইরুলেন্স এবং মৃত্যুর হার

এই প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুর সংখ্যা অনিশ্চিত। কিছু আধুনিক পন্ডিত মনে করেন, মহামারীর শীর্ষে থাকা অবস্থায় কনস্টান্টিনোপলে প্লেগের কারণে প্রতিদিন ৫,০০০ মানুষ মারা যায়। এক দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায়, প্রাথমিক প্লেগ শেষ পর্যন্ত শহরের অধিবাসীদের ৪০% কে হত্যা করে এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের এক-চতুর্থাংশ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্লেগের ঘন ঘন পরবর্তী তরঙ্গগুলি ৬ষ্ঠ, ৭ম এবং ৮ম শতাব্দী জুড়ে আঘাত হানতে থাকে, যেখানে এই রোগটি আরও স্থানীয় এবং কম ভাইরুলেন্ট হয়ে ওঠে। কতিপয় ঐতিহাসিক মনে করেন, প্রথম প্লেগ মহামারী ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক মহামারীগুলির মধ্যে একটি ছিল, যার দুই শতাব্দীর পুনরাবৃত্তির কালে আনুমানিক ১৫-১০০ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল, যা প্রথম প্রাদুর্ভাবের সময় ইউরোপের জনসংখ্যার ২৫-৬০% এর সমতুল্য ছিল। তবে ২০১৯ সালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে যে দুইশ বছর ধরে চলা এই মহামারীর মৃত্যুর সংখ্যা এবং সামাজিক প্রভাবকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে, গবেষণায় একে আধুনিক তৃতীয় প্লেগ মহামারীর (১৮৫৫-১৯৬০ এর দশকের) সাথে তুলনা করা হয়েছে।

লি মর্ডেচাই এবং মেরলে আইজেনবার্গের মতো পণ্ডিতদের দ্বারা প্রকাশিত একটি সংশোধনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তি দেয় যে জাস্টিনিয়ান প্লেগের মৃত্যুর হার আগে যা মনে করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক কম ছিল। তারা বলেন যে প্লেগটি নির্দিষ্ট জায়গায় উচ্চ মৃত্যুর কারণ হতে পারে, তবে এটি ব্যাপক জনসংখ্যাতাত্ত্বিক হ্রাস বা ভূমধ্যসাগরীয় জনসংখ্যাকে ধ্বংস করে দেয়নি। তাদের মতে, প্লেগের যে কোনও সরাসরি মধ্য-থেকে-দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সামান্য ছিল। যাইহোক, তাদের অবস্থানটি অতীত এবং বর্তমান জার্নালে পিটার সারিসের একটি সমন্বিত সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তিনি তাদের মূল পদ্ধতি এবং উৎসগুলোর পরিচালনা উভয়কেই চ্যালেঞ্জ করেছেন (P. Sarris ‘New Approaches to the Plague of Justinian’, Past and Present advanced access 13 November 2021)। সারিস জেনেটিক প্রমাণের আপ-টু-ডেট আলোচনাও সরবরাহ করেন, যার মধ্যে রয়েছে প্লেগটি একাধিক পথের মাধ্যমে পশ্চিম ইউরেশিয়ায় প্রবেশ করতে পারে, এটি সম্ভবত কনস্টান্টিনোপলের আগে ইংল্যান্ডে আঘাত হেনেছিল (কেমব্রিজের কাছে এডিক্স হিলের একটি প্রাথমিক অ্যাংলো-স্যাক্সন কবরস্থানে প্লেগ আক্রান্তদের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে দাবিটি করা হয়)।

জাস্টিনিয়ানের প্লেগ (৫৪১-৫৪৯ খ্রি.)

জাস্টিনিয়ানের প্লেগ বা জাস্টিনিয়ানিক প্লেগের (Plague of Justinian) ছিল প্রথম প্লেগ মহামারীর প্রথম এবং সর্বাধিক পরিচিত তরঙ্গ। এর সময়কাল ছিল ৫৪১-৫৪৯ খ্রিস্টাব্দ। এটি ছিল প্রথম প্লেগ মহামারী বা ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড প্যান্ডেমিকের প্রথম বড় প্রাদুর্ভাব। এটি হলো ওল্ড ওয়ার্ল্ড বা আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়ায় প্লেগের প্রথম মহামারী। এই সময়ে প্লেগ মহামারী সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অববাহিকা, ইউরোপ, এবং নিকট প্রাচ্যকে আক্রান্ত করেছিল, এবং সাসানীয় সাম্রাজ্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং বিশেষ করে এর রাজধানী কনস্টান্টিনোপলকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই প্লেগ কনস্টান্টিনোপলের বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ানের (রা. ৫২৭-৫৬৫ খ্রি.) নামে নামকরণ করা হয়, যিনি তার রাজসভার ইতিহাসবিদ প্রোকোপিয়াস অনুসারে এই রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ৫৪২ সালে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন, এই এপিডেমিক তার সর্বোচ্চ প্রভাবকালে কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রায় এক পঞ্চমাংশ লোকের মৃত্যু ঘটায়। রোমান মিশরে এই মহামারিটি ৫৪১ সালে প্রবেশ করে, এবং ৫৪৪ সালের মধ্যে ভূমধ্যসাগরের চারদিকে ছড়িয়ে যায়, এবং ৫৪৯ সাল পর্যন্ত উত্তর ইউরোপ ও আরব উপদ্বীপে টিকে থাকে। ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় গবেষকগণ নিশ্চিত করেন যে, এই মহামারী আর ১৩৪৭-১৩৫১ সালের ব্ল্যাক ডেথের কারণ একই ছিল, সেই ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস দ্বারা সৃষ্ট প্লেগ মহামারী। কিরগিজস্তান, কাজাখস্তান ও চীনের সীমান্ত অঞ্চলে তিয়েন শান নামে পর্বতমালার একটি সিস্টেম অবস্থিত। সেখানে প্রাপ্ত জাস্টিনিয়ান প্লেগের স্ট্রেইনগুলোর পূর্বপুরুষের সাথে ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস বর্তমান ও প্রাচীন স্ট্রেইনগুলোর ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, যা নির্দেশ করছে, জাস্টিনিয়ান প্লেগের উদ্ভব হয়েছিল এই অঞ্চল থেকেই।

বাইজেন্টাইন ঐতিহাসিক প্রকোপিয়াস ৫৪১ সালে মিশরের সুয়েজের নিকটবর্তী পেলুসিয়াম বন্দর থেকে প্রথম এই মহামারীর কথা জানান। প্লেগের ধ্বংসযজ্ঞের আরও দুটি প্রথম দিকের প্রতিবেদন ছিল সিরিয়াক গির্জার ইতিহাসবিদ ইফিসাসের জন এবং ইভাগ্রিউস স্কলাস্টিকাস, যিনি সেই সময় এন্টিওকের একটি শিশু ছিলেন এবং পরে গির্জার ইতিহাসবিদ হয়েছিলেন। ইভাগ্রিউস এই রোগের সাথে যুক্ত বুবোতে আক্রান্ত হয়েছিলেন কিন্তু বেঁচে গিয়েছিলেন। তার জীবদ্দশায় এই রোগের চারটি প্রত্যাবর্তনে তিনি তার স্ত্রী, এক মেয়ে এবং তার সন্তান, অন্যান্য সন্তান, তার বেশিরভাগ চাকর এবং তার দেশের এস্টেটের লোকদের হারিয়েছেন।

সমসাময়িক সূত্র অনুসারে, কনস্টান্টিনোপলের প্রাদুর্ভাবটি মিশর থেকে আগত শস্যের জাহাজে সংক্রামিত ইঁদুর দ্বারা শহরে বাহিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়েছিল। শহরটির নাগরিকদের খাদ্যের জন্য, শহর এবং বহির্মুখী সম্প্রদায়গুলি প্রচুর পরিমাণে শস্য আমদানি করেছিল, যেগুলোর বেশিরভাগই আনা হয় মিশর থেকে। সরকার দ্বারা পরিচালিত বড় শস্যভাণ্ডার থেকে খাদ্য গ্রহণ করে মিশরের ইঁদুরের (এবং মাছি) সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

প্রোকোপিয়াস, থুসিডাইডসের লেখার উপর মডেল করে রেকর্ড করেন যে, প্লেগটি তার শিখরে প্রতিদিন কনস্টান্টিনোপলে ১০,০০০ লোককে হত্যা করছে, তবে এই চিত্রের নির্ভুলতা প্রশ্নবিদ্ধ, এবং প্রকৃত সংখ্যাটি সম্ভবত কখনই জানা যাবে না। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, যেহেতু মৃতদেহগুলি কবর দেওয়ার কোনও জায়গা ছিল না, তাই মৃতদেহগুলি খোলা জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার-অনুষ্ঠানগুলি প্রায়শই অগ্রাহ্য করা হত, এবং পুরো শহরটি মৃতদের মতো গন্ধ পেত। তার গোপন ইতিহাসে, তিনি গ্রামাঞ্চলের ধ্বংসযজ্ঞের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন এবং কঠোর পরিশ্রমী জাস্টিনিয়ানের নির্মম প্রতিক্রিয়ার কথা জানিয়েছেন এভাবে, ‘যখন মহামারী সমগ্র পরিচিত বিশ্ব এবং বিশেষ করে রোমান সাম্রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, বেশিরভাগ কৃষক সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে দেয় এবং তার জাগরণে ধ্বংসের পথ ছেড়ে চলে যায়, তখন জাস্টিনিয়ান ধ্বংসপ্রাপ্ত জমির মালিকদের প্রতি কোন করুণা দেখাননি। তারপরেও, তিনি বার্ষিক কর দাবি করা থেকে বিরত থাকেননি, তিনি শুধু প্রতিটি ব্যক্তির কাছ থেকেই কর আদায় করেননি, সেই সাথে প্রতিটি ব্যক্তির মৃত প্রতিবেশীরা যে পরিমাণের জন্য দায়বদ্ধ ছিল তাও তিনি ট্যাক্সে অন্তর্ভূক্ত করেন।’

গ্রামাঞ্চলে প্লেগের ফলে, কৃষকরা ফসলের যত্ন নিতে পারেনি এবং কনস্টান্টিনোপলে শস্যের দাম বেড়েছে। জাস্টিনিয়ান কার্থেজ অঞ্চলে ভান্ডালদের বিরুদ্ধে এবং ইতালিতে অস্ট্রোগোথদের রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রচুর পরিমাণে অর্থ ব্যয় করেছিলেন। তিনি হাজিয়া সোফিয়ার মতো মহান গীর্জা নির্মাণে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ করেছিলেন। যেহেতু সাম্রাজ্য প্রকল্পগুলিকে অর্থায়ন করার চেষ্টা করেছিল, প্লেগের ফলে বিপুল সংখ্যক মৃত্যু এবং কৃষি ও বাণিজ্যের বিঘ্নের মাধ্যমে করের রাজস্ব হ্রাস পেয়েছিল। ভুক্তভোগীদের মৃত্যুর ফলে আনা উত্তরাধিকারের মামলাগুলো আরও দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করার জন্য জাস্টিনিয়ান দ্রুততার সাথে নতুন আইন প্রণয়ন করেছিলেন।

ইউরোপীয় ও খ্রিস্টান ইতিহাসে প্লেগের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ছিল বিশাল। এই রোগটি ভূমধ্যসাগরের আশেপাশের বন্দর শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে, সংগ্রামী গথরা পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল এবং কনস্টান্টিনোপলের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছিল। প্লেগ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দুর্বল করে দিয়েছিল, যখন জাস্টিনিয়ানের সেনাবাহিনী ইতালি এবং পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলকে প্রায় পুনরুদ্ধার করে ফেলেছিল; এই বিজয় পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সাথে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের মূল অংশকে পুনরায় একত্রিত করতে পারত। যদিও ৫৫৪ সালে বিজয়টি সংঘটিত হয়েছিল, তবুও পুনর্মিলনটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ৫৬৮ খ্রিষ্টাব্দে লোম্বার্ডরা উত্তর ইতালি আক্রমণ করে ইতালিতে ছেড়ে আসা ছোট বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে লোম্বার্ডদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। গল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল, তাই এর ফলে ব্রিটেন যে আক্রমণের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল তার সম্ভাবনা কম।

আয়ারল্যান্ডে সংঘটিত মোহিলের প্লেগ (৫৪১-৫৪৯ খ্রি.)

ভূমিকা

৬ষ্ঠ শতাব্দীতে আয়ারল্যান্ডে, মোহিলের জনসংখ্যা জাস্টিনীয় প্লেগ দ্বারা বিধ্বস্ত হয়েছিল, যা ৫৩৬-৬৬০ খ্রিস্টাব্দের লেইট অ্যান্টিক লিটল আইস এজ এর একটি প্রাথমিক ঘটনা। মোহিল প্লেগটি ৫৩৫-৫৩৬ সালের চরম আবহাওয়ার ঘটনা বা এক্সট্রিম ওয়েদার ইভেন্ট এবং মোহিলের মানচানের (Manchán of Mohill) মৃত্যুর পরে সংঘটিত হয়েছিল।

প্রমাণ

মোহিল ব্যারনিতে জাস্টিনীয় প্লেগের প্রমাণ মোহিল শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে তিনটি সংলগ্ন টাউনল্যান্ডের নাম দ্বারা প্রকাশিত হয়, যেগুলো হচ্ছে টামলাঘট মোরে, টামলাঘট বেগ, এবং টামলাঘটাভালি – সবগুলোর নামকরণই হয়েছে মোহিলের প্রাক্তন মঠকে ঘিরে। যেহেতু টামলাঘট (আইরিশ: Taimhleacht বা টাইমলেখট) একটি পৌত্তলিক নাম, তাই তিনটি টাউনল্যান্ডের নামই প্রাচীন এবং প্রাক-খ্রিস্টীয়। টামলাখট শব্দটি প্লেগ সমাধিস্থলকে বোঝায় সেই দাবিটি পণ্ডিতমহলে স্বীকৃত। কিন্তু এই সময়ের ভুক্তভোগী লোকেদের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল তা আমাদের অজানা। মোহিলের প্লেগের জ্ঞান ১৯৭৫ সালের পর আবির্ভূত হয়, যখন গাফনি নামে একজন স্থানীয় স্কুল শিক্ষক তার এই বিবরণ লিখেছিলেন, ‘টামলাঘাভ্যালি টাউনল্যান্ড : তাইভলিয়াচ আ’ভাইলে বা টাইভলিয়াচ অ্যান ভৈলাইগ, হলো শহর বা রাস্তার প্লেগ সমাধিস্থল। Taibhleacht শব্দটি tamh বা taimh এবং leacht থেকে উদ্ভূত হয়, tamh বা taimh দ্বারা প্লেগের ফলে কোন অস্বাভাবিক মৃত্যুকে বোঝানো হয়, এবং leacht দ্বারা সমাধিস্থলকে বোঝায়, অর্থাৎ শব্দটি এমন স্থানকে নির্দেশ করে যেখানে প্লেগের ফলে মৃতদের সমাধিস্থ করা হয়েছে। এই পথ ধরে যারা যেত তারা সমাধির ওপরে একটি পাথর রেখে সমাধিস্থলের ওপরে পাথরের স্তূপ তুলত। টামলাঘট-বেগ এবং টামলাঘমোর শব্দগুলোও একই উৎসের। কোন বিশাল প্লেগ বা মহামারী এই তিনটি টাউনল্যান্ডে তার নাম রেখে গিয়েছিল।’

হ্যানলি (২০০২) মোহিল ব্যারনিকে জাস্টিনীয় প্লেগের সাথেও চিহ্নিত করেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে আয়ারল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৪১টি টামলাচটা সাইট জলের সাথে যুক্ত – কিন্তু মোহিল এগুলোর ব্যতিক্রম। যাইহোক, মোহিল (আইরিশ: মাওথাইল “নরম বা স্পঞ্জি জায়গা”) জলপথের সাথে সংযুক্ত – এর নিকটবর্তী লফ রিন নদীতে জলধারা নিয়ে যায়, যা নিজে আবার শ্যানন নদীর একটি উপনদী। হ্যানলি মনে করতেন যে সীমান্তবর্তী এয়ারজিয়াল্লা রাজ্য মহামারীর কারণে অনন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডুলি মনে করেন, ৫৫০ খ্রিস্টাব্দে আরেকটি মহামারী ঘটে, যার নামকরণ করা হয়েছে ক্রেইন কোনাইল (croin Chonaill, কোনেইল (একটি অঞ্চল) এর লালভাব), বা বুইধে কোনাইল (buidhe Chonaill, কোনেইলের হলুদভাব)। উভয়ই নামেই নির্দেশ করে যে শ্যানন এলাকায় তখন বিস্তৃত প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল।

কারণ

আইরিশ গাছের ডেনড্রোকনোলজি গবেষণা থেকে ৫৩৮ সালের পরের দশকে হঠাৎ জলবায়ু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এবং আয়ারল্যান্ডে বুবোনিক প্লেগের আগমন আনু. ৫৪৪ খ্রিস্টাব্দের হয়, যা জাস্টিনিয়ানিক প্লেগের পশ্চিমমুখী গতিপথের সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে মনে হয়, যেটা ৫৪৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গলে পৌঁছেছিল। মধ্যযুগীয় আইরিশ ইতিহাসের ক্রোনিকল “অ্যানালস অফ দ্য ফোর মাস্টার্স” বলছে, “৫৪৩ খ্রিস্টাব্দে সারা বিশ্বে এক অস্বাভাবিক সার্বজনীন প্লেগ ছেয়ে গিয়েছিল, যা মানবজাতির সবচেয়ে মহৎ এক তৃয়াংশকে ভাসিয়ে দিয়েছিল”, এবং আলস্টারের অ্যানালস মহামারীকে “ব্লিফেড” নামকরণ করেছিল। এটি অনুমান করা হয় যে, দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ২৫-৫০ মিলিয়ন ইউরোপীয়, বা ইউরোপীয় জনসংখ্যার ৪০% মারা গিয়েছিল কারণ প্লেগটি ৮ম শতাব্দী পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ফিরে এসেছিল।

ঐতিহ্য

হ্যালি পর্যবেক্ষণ করেছেন কিভাবে “টামলাখটা সাইটের সংখ্যা দ্বারা প্রস্তাবিত ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে বিশাল মৃত্যুর ঘটনা যদি ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি নাও করে থাকে, তবুও নিশ্চিতভাবেই তা ভয়ের সৃষ্টি করে। এটি এমন একটি মহামারী ছিল যেখানে কিছু লোক এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে মারা গিয়েছিল, কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল কিন্তু সুস্থ হয়ে উঠেছিল, এবং কেউ কেউ প্রভাবিত হয়নি। এই ধরনের আপাতদৃষ্টিতে এলোমেলো ফলাফলগুলোকে জনসাধারণ ঐশ্বরিক নির্বাচন বলে ব্যাখ্যা করতে পারে, যাজকগণও এটাই প্রচার করে থাকতে পারে।”

মোহিলে এই প্রাদুর্ভাবের সময় একজন খ্রিস্টান মিশনারির উপস্থিতি এবং মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। খ্রিস্টধর্মে রূপান্তর এবং পরবর্তী সময়ে স্থানীয় জনগণের দ্বারা সেইন্ট হিসাবে মোহিলের মাঞ্চনের (মৃ. ৫৩৮) উপাসনা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। আজ তিনি “মোহিল-মাঞ্চান” (“Mohill-Manchan”) নামে পরিচিত।

হানলি ৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দের প্লেগের পর মানুষের দ্বারা প্রচুর পরিমাণে রিংফোর্ট-বিল্ডিং বা রিংফোর্টের একটি বড় উত্থানের কথা জানিয়েছেন। রিংফোর্ট বা রিং ফোর্ট্রেস হলো একরকম বৃত্তাকার দুর্গকৃত বা ফোর্টিফায়েড বসতি। বেশি করে রিংফোর্ট বানাবার একটা কারণ ছিল। সেটা হচ্ছে সেই সময়ে সেই অঞ্চলের অধিবাসীরা এয়ারজিয়াল্লা এবং মোহিল (ব্যারনি) এর বিধ্বস্ত অঞ্চলের সীমানার লোকেরা এই রহস্যময় এবং ব্যাপক মৃত্যু, সহিংসতা, গবাদি পশু চুরি বা ডাকাতি, দাসত্ব এবং আরও খারাপ বিষয় থেকে নিরাপত্তার সন্ধান করেছিল। এই দুর্গগুলোর (রাথস (Raths) নামে পরিচিত) সাথে পরিখা ছিল, যা আইরিশরা তাদের বাড়িগুলির সাথেও বানাতো। মোহিলের প্রাচীন ব্যারনির চারপাশে এই দুর্গগুলোর অসংখ্য ধ্বংসাবশেষ দৃশ্যমান।

ফ্রান্সিয়ার প্লেগ (৫৪১- )

৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে ট্যুরের বিশপ-ক্রনিকলের গ্রেগরি অফ ট্যুরস-এর মতে, ৫৪০-এর দশকের শেষের দিকে জাস্টিনিয়ানিক প্লেগ আরেলেট (আরলেস) (Arelate (Arles)) এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আঘাত হানার পরে ফ্রাঙ্কদের রাজ্যে প্লেগের অসংখ্য মহামারী দেখা দেয়। দুর্যোগের বিভিন্ন নিদর্শন দেখা গিয়েছিল এবং সেগুলোকে নির্মূল করার জন্য প্রভাবিত এলাকার অধিবাসীরা মিছিল, প্রার্থনা এবং নজরদারির আশ্রয় নিয়েছিল।

গ্রেগরি ৫৭১ সালে অভার্ন (Auvergne) এবং ডিভিও (বর্তমান ডিজন) (Divio (Dijon)), এভারিকাম (বর্তমান বোর্জ) (Avaricum (Bourges)), ক্যাবিলোনাম (বর্তমান শালোঁ-স্যু-সোঁ) (Cabillonum (Chalon-sur-Saône)), এবং লুগডানাম (বর্তমান লিওঁ) (Lugdunum (Lyon)) শহরে মহামারীর রেকর্ড করেন। গ্রেগরির প্লেগের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখেন এটি বগল বা কুঁচকিতে ক্ষত সৃষ্টি করে যা তিনি সাপের কামড়ের অনুরূপ বলে বর্ণনা করেছেন। সেই সাথে তার বর্ণনায় রোগী দুই বা তিন দিনের মধ্যে মারা যায়। এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে রোগীরা বুবোনিক প্লেগে আক্রান্ত ছিল, কারণ এখানে “ক্ষত” এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বুবোস (buboes)।

৫৮২ সালে গ্রেগরি অফ ট্যুরস নারবো মার্টিয়াসে (বর্তমান নারবোন) (Martius (Narbonne)) একটি মহামারী রিপোর্ট করেন। তার মতে, ৫৮৪ সালে আলবিতে (Albi) বেশিরভাগ শহরবাসী প্লেগের প্রাদুর্ভাবে মারা যায়।

ম্যাসিলিয়া (বর্তমান মার্সেই) (Massilia (Marseille)) ৫৮৮ সালে প্লেগ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল; সেখানে ফ্রান্সিয়ার রাজা গুন্তরাম বার্লি রুটি এবং জলের কঠোর ডায়েটের পরামর্শ দিয়েছিলেন। গ্রেগরি হিস্পানিয়া থেকে আসা একটি জাহাজকে সংক্রমণের উৎস হিসাবে দোষারোপ করেছেন, এবং এর পরে মহামারীটির বেশ কয়েকবার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল।

৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে গ্রেগরি ভিভারিয়াম (বর্তমান ভিভিয়ারস) (Vivarium (Viviers)) এবং আভেনিওতে (বর্তমান এভিনো) (Avenio (Avignon)) আরেকটি প্লেগ মহামারী রেকর্ড করে, যখন পোপ দ্বিতীয় পেলাগিয়াসের অধীনস্ত রোমে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে।

৫৯০ সালের রোমান প্লেগ

ভূমিকা

৫৯০ সালের রোমান প্লেগ ছিল প্লেগের একটি মহামারী যা ৫৯০ সালে রোম শহরকে আক্রান্ত করেছিল। সম্ভবত এটি বুবোনিক প্লেগ ছিল। এটি প্রথম প্লেগ মহামারীর অংশ ছিল যা যা ৫৪০-এর দশকে শুরু হওয়া জাস্টিনিয়ানের মহান প্লেগের পরে ঘটেছিল। বিশ্বের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার আগে এই প্লেগতি ১০০ মিলিয়নেরও বেশি ইউরোপীয়কে হত্যা করে থাকতে পারে এবং যা লেইট অ্যান্টিকুইটির শেষ পর্যন্ত বর্তমান ছিল। বিশপ এবং ক্রনিকলার গ্রেগরি অফ ট্যুরস এবং পরে ঐতিহাসিক পল দ্য ডিকন এই প্লেগকে বর্ণনা করেন।

ইতিহাস

প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার আগে শীতকালে, ৫৮৯ সালের নভেম্বরে টাইবার বন্যার সময় রোমের অনেক শস্যভাণ্ডার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। ট্যুরের গ্রেগরি বর্ণনা করেছেন যে জলে দুর্যোগময় সর্প এবং ড্রাগন দেখা গেছে। ৫৯০ সালের প্রথম দিকে এই মহামারী শুরু হয়; গ্রেগরির বর্ণনাটি নির্দিষ্ট নয় তবে দ্রুত সংক্রামিত রোগীদের মৃত্যু ঘটেছিল, এবং গ্রেগরি এই রোগটিকে ‘কুঁচকির প্লেগ’ (ল্যাটিন: লুইস ইঙ্গুইনারিয়া) হিসাবে বর্ণনা করেছেন, যা এর বুবোনিক প্লেগ হিসাবে সনাক্তকরণকে সহায়তা করে। রোমের বিশপ দ্বিতীয় পেলাগিয়াস ৫৯০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এবং পোপ প্রথম গ্রেগরি প্রথম, যিনি তখন একজন ডিকন ছিলেন, তিনি তার উত্তরসূরি নির্বাচিত হন। সন্ন্যাসী হওয়ার আগে গ্রেগরি এর আগে প্রেফেক্টাস উরবি (praefectus urbi) ছিলেন। গ্রেগরি এর আগে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের এক ধরনের পোপাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে একজন অ্যাপোক্রিসিয়ারিয়াস হিসেবে কাজ করেছিলেন, যেখানে তিনি সম্ভবত বাইজেন্টাইন চর্চা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। রাজকীয় রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে একটি অনুশীলন প্রচলিত ছিল, যেখানে শহরের রাস্তায় বিশ্বাসী খ্রিস্টানরা শহরের রাস্তায় ঈশ্বরের ক্রোধ দূর করার জন্য গীতসংহিতা এবং কিরি এলিসন (বিশেষ ধরণের ধর্মীয় সংগীত) গান গাইত এবং মাতা মেরীর কাছে সুরক্ষার জন্য প্রার্থনা করত। গ্রেগরি সম্ভবত কনস্টান্টিনোপলে থাকার সময় এই মিছিলগুলি প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

পোপের মিছিল

৫৯০ সালে যখন প্লেগ রোমে ছিল এবং গ্রেগরি তখনও একজন ডিকন ছিলেন, তখন তিনি রোমে এমন একটি মিছিলের আয়োজন করেছিলেন যেখানে সাতটি দল শহরের রাস্তায় মিছিল করবে এবং ভার্জিন মেরির কাছে সুরক্ষার প্রার্থনার জন্য মেরি মেজরের বেসিলিকায় গিয়ে শেষ হয়। ২৫ এপ্রিল, ৫৯০ তারিখে মিছিলগুলো অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলের মেরিবাদী দিকটি সম্ভবত সেই সময়ে অস্বাভাবিক ছিল, কারণ রোম ঐতিহ্যগতভাবে সেন্ট পিটারের কাছে সুরক্ষার জন্য প্রার্থনার সাথে সম্পর্কিত ছিল, তবে বাইজেন্টাইন প্রভাবের ফলস্বরূপ এই মেরীবাদী ধারাটি রোমে আসতে পারে, কারণ কনস্টান্টিনোপলকে প্রায়শই সংকটের সময় থিওটোকোস অর্থাৎ মাতা মেরীর সুরক্ষার অধীনে রাখা হতো। সাতটি মিছিলকারী দল ছিল: ১) যাজক, ২) মঠপালক ও সন্ন্যাসী, ৩) মঠ ও সন্ন্যাসিনী, ৪) পুরুষ ৫) বিবাহিত নারী ৬) বিধবা ও ৭) শিশু (সম্ভবত রোমের দরিদ্রসহ)। প্লেগ এবং অন্যান্য জাতীয় দুর্যোগকে সেই সময়ে সাধারণত মানব সমাজের পাপের জন্য ঈশ্বরের শাস্তি হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, আর তাই ঈশ্বরের ক্রোধকে তুষ্ট করার জন্য এই ব্যবস্থাগুলি নেওয়া হয়েছিল। মিছিলের সময় প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে ৮০ জন মানুষ মারা যায়।

পোপ গ্রেগরির দর্শন

পরবর্তী কিংবদন্তী অনুসারে, মিছিলটি যখন ভ্যাটিকান হিলের কাছে টাইবারের ডান তীরে রোমান সম্রাট হাড্রিয়ানের সমাধিসৌধের দিকে এগিয়ে যায়, তখন পোপ গ্রেগরি একটি দর্শন পান যখন। পোপ আর্চএঞ্জেল সেন্ট মাইকেলকে দেখতে পান, তিনি এখেন মাইকেল স্মৃতিসৌধের উপরে দাঁড়িয়ে তার খাপ থেকে তলোয়ারটি খুলে দেখালেন ও তারপর সেটাকে পুনরায় খাপে ভরলেন। এখানে তলোয়ারটি খুলে ফেলা বলতে বোঝানো হয়েছিল যে ঈশ্বরের ক্রোধ সকলের উপর বর্ষিত হয়েছে, আর তলোয়ার পুনরায় খাপে ভরা হলো – এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে ঈশ্বর তার ক্রোধ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ধরে নেয়া হয় যে তখন প্লেগের সমাপ্তি ঘটেছে। এরপর বিশ্বাসীরা মাতা মেরীকে ধন্যবাদ জানায়।

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর রাজকীয় সমাধি, যা লেইট এন্টিকুইটির সময় একটি দুর্গে পরিণত হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে কাস্টেল সান্ত’অ্যাঞ্জেলো (Castel Sant’Angelo) অর্থাৎ “পবিত্র দেবদূতের প্রাসাদ”-এ পরিণত হয়। ১৮শ শতাব্দীতে পোপ গ্রেগরির এই দর্শনের কিংবদন্তীটিকে স্মরণ করার জন্য ক্যাস্টেল সান্ত’অ্যাঞ্জেলোর শিখরে একটি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল, যা রোমান বর্ম পরিহিত ডানাযুক্ত আর্চঅ্যাঞ্জেল বা মহাদেবদূতকে চিত্রিত করেছিল। এর ডিজাইন করেছিলেন ১৭৫৩ সালে পিটার অ্যান্টন ফন ভার্শাফল্ট।

শেরো এর প্লেগ (৬২৭-৬২৮)

শেরো এর প্লেগ (Plague of Sheroe) (৬২৭-৬২৮) একটি মহামারী ছিল যা সাসানীয় সাম্রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলিকে, প্রধানত মেসোপটেমিয়াকে (এসোরেস্তান) ধ্বংস করে দিয়েছিল, এবং তদকালীন সাসানীয় রাজা (শাহ্‌) দ্বিতীয় কাভাদ শেরো (রা. ৬২৮ খ্রি.) সহ সেখানকার জনসংখ্যার অর্ধেক এর ফলে মারা যায়। রাজার নামেই এই প্লেগটির নামকরণ করা হয়।

সাসানীয় সেনাবাহিনী কনস্টান্টিনোপল, সিরিয়া এবং আর্মেনিয়ায় তাদের অভিযান থেকে প্রথম পারস্যে প্লেগ মহামারী নিয়ে আসে। এরপর দুই শতাব্দীর মধ্যে বর্তমান ইরান বা তার কাছাকাছি বেশ কয়েকটি প্লেগ মহামারী ঘটেছিল। এগুলোর মধ্যে এই শেরো এর প্লেগ ছিল অন্যতম। এটি সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতনে অবদান রেখেছিল।

আমওয়াসের প্লেগ (৬৩৮-৩৯ খ্রি.)

ভূমিকা

আমওয়াসের প্লেগ (Plague of Amwas) প্রথম প্লেগ মহামারীর সময়কার একটি বুবোনিক প্লেগ মহামারী ছিল যা ৬৩৮-৬৩৯ সালে সিরিয়ায় মুসলিম বিজয়ের শেষের দিকে সিরিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। এটি সম্ভবত ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ঘটা জাস্টিনিয়ানের প্লেগের পুনরুত্থান ছিল। সেই সময়ে মুসলিম আরব সেনাবাহিনীর প্রধান ক্যাম্পটি স্থাপিত হয়েছিল ফিলিস্তিনের আমওয়াসে, এই নাম থেকেই প্লেগটির নামকরণ করা হয়। এই মহামারীর ফলে মুসলিম শিবিরের ২৫,০০০ সৈন্য এবং তাদের আত্মীয়রা মারা যায়, মুসলিম সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ হাই কমান্ডের সেনাও এর ফলে মারা যায়। এটির ফলে প্রচুর সিরিয়ার অধিবাসী খ্রিস্টানের মৃত্যু ও স্থানচ্যুতি ঘটে। সিরিয়ায় মুসলিম জেনারেলদের মৃত্যুর কারণে তদকালিন মুসলিম খলিফা উমর সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ানকে নিয়োগ করেন। আর সেখানে মুসলিম কমান্ডারদের মৃত্যুই মুয়াবিয়ার দ্বারা ৬৬১ সালে উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠার পথকে প্রশস্ত করে। মজার ব্যাপার হলো এই মহামারীর পুনরাবৃত্তিই আবার ৭৫০ সালে উমাইয়া রাজবংশের পতনের মাধ্যমে আব্বাসিদ রাজবংশের উত্থানে অবদান রেখে থাকতে পারে। সিরিয়ার ক্ষেত্রে ইসলামীকরণ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ইসলামীকরণের মধ্যে একটা পার্থক্য দেখা যায়। অন্যান্য জায়গায় মুসলিম বিজয়ের ক্ষেত্রে আরবরা তাদের তৈরি নতুন গ্যারিসন বা শিবিরস্থলগুলোতে নিজেদের অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখত। কিন্তু সিরিয়ায় মুসলিম বিজয়ের ক্ষেত্রে সেটা দেখা যায়না। এখানে বরং দেখা যায়, সেই অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যায় আরবদেরকে এনে নতুন করে বসতি স্থাপন ও আরবদের দ্বারা ভূমিপুনর্বাসন করা হচ্ছে। এই পার্থক্যের ব্যাখ্যা হিসেবে এই আমওয়াসের প্লেগ মহামারীকেই নিয়ে আসা হয়। এই মহামারীতে সিরিয়ার গ্রামাঞ্চলে জনসংখ্যার যে ব্যাপক আকারে হ্রাস ঘটে, তার জন্যই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।

১৪শ শতাব্দীর ব্ল্যাক ডেথ পর্যন্ত আমওয়াসের প্লেগ অন্য যে কোনও মহামারীর চেয়ে আরবি উৎসগুলিতে বেশি মনোযোগ লাভ করেছিল। এই আমওয়াসের প্লেগের ফলে খলিফা উমর এবং তার শীর্ষ কমান্ডার আবু উবাইদা ইবনে আল-জাররাহ যে সব প্রতিক্রিয়া দেখান, সেই ঐতিহ্যগত আখ্যানগুলোর ওপর ভিত্তি করেই মধ্যযুগীয় মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিকগণ পরবর্তীতে ব্ল্যাক ডেথ সহ অন্যান্য মহামারীতে মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিৎ সে সম্পর্কিত তত্ত্বায়ন করেন। আমওয়াসের প্লেগ থেকে উঠে আসা সেই আখ্যানগুলিকেই পরবর্তীতে ধর্মতাত্ত্বিকদের নির্ধারণবাদ (predestination) বনাম স্বাধীন ইচ্ছা (free will) বিতর্ক, প্লেগ-প্রভাবিত ভূমি থেকে কারও পালিয়ে যাওয়া বা সেখানে অন্যদের প্রবেশ করায় নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বিষয়ে বিতর্ককে প্রভাবিত করে।

উৎপত্তি এবং রাজনৈতিক সেটিংস

আমওয়াসের প্লেগ সম্ভবত একটি বুবোনিক প্লেগ মহামারী ছিল, যদিও উৎসগুলি এই রোগের নির্দিষ্ট লক্ষণগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে কিছু বলেনি। এটি ছিল ইসলামী যুগের দ্বিতীয় রেকর্ডকৃত প্লেগ, যার প্রথমটি ঘতে ৬২০-এর দশকের শুরুতে। তবে মুসলমানদের সরাসরি আক্রান্ত করা প্লেগগুলোর মধ্যে এটিই ছিল প্রথম। এটি সম্ভবত জাস্টিনিয়ানের প্লেগের পুনরুত্থান ছিল, যা ৫৪১ খ্রিস্টাব্দে পেলুসিয়াম (আধুনিক সুয়েজের কাছাকাছি) থেকে উদ্ভূত হয়েছিল এবং ৫৪১-৫৪২ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছানোর আগে পশ্চিম থেকে আলেকজান্দ্রিয়া এবং পূর্ব দিকে ফিলিস্তিনে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপ ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের বাকি অংশকে প্রভাবিত করে, যেমনটি বাইজেন্টাইন ইতিহাসবিদ প্রোকোপিয়াস (মৃ. ৫৭০ খ্রি.) উল্লেখ করেছেন। জাস্টিনিয়ানের প্লেগ ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি এবং ৭ম শতাব্দী জুড়ে কমপক্ষে নয় থেকে বারোটি চক্রে পুনরাবৃত্তি হয়েছিল।

প্রথম খলিফা আবু বকর (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.) বাইজেন্টাইন সিরিয়া জয় করার জন্য আমর ইবনে আল-আস, ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান, শুরাহবিল ইবনে হাসনা এবং আবু উবাইদা ইবনে আল-জাররাহ-এর নেতৃত্বে মদিনা থেকে চারটি বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন (৬৩৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে আবু বকরের উত্তরাধিকারী হিসেবে খলিফা উমরের ক্ষমতায় আরোহনের মধ্যে আবু উবাইদাকে প্রেরণ করা নাও হয়ে থাকতে পারে)। আমওয়াস হচ্ছে এমাউস-নিকোপলিসের আরবি নাম। এটি ছিল খ্রিস্টীয় ১ম শতাব্দীতে একটি শক্তিশালী রোমান সেনা শিবির, যা ৩য় শতাব্দীর গোড়ার দিকে একটি ছোট শহরে পরিণত হয়েছিল। ৬৩৪ সালের আজনাদাইনের যুদ্ধ বা ৬৩৬ সালে ইয়ারমুকের যুদ্ধের পরে বাইজেন্টাইনদের কাছ থেকে মুসলমানরা এটি দখল করে। প্লেগের শুরুতে, এই স্থানটি সিরিয়ায় আরব মুসলিম সৈন্যদের প্রধান শিবির হিসাবে কাজ করেছিল যেখানে আরবদের লুণ্ঠনকে ভাগাভাগি করে নেয়া হয়, এবং প্রাপ্ত সম্পদ থেকে সৈন্যদের অর্থ প্রদান করা হয়।

কালপঞ্জি

আমওয়াসের প্লেগ হিজরি ১৭ অব্দ বা ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ এবং/অথবা হিজরি ১৮ অব্দ বা ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয়েছিল। ৮ম শতাব্দীর ইতিহাসবিদ সাঈফ ইবনে উমরের মতে, এটি মহররম-সাফার ১৭ হিজরি/জানুয়ারি-৬৩৮-এ আঘাত হানে এবং তারপর পরের বছর আরও একবার ফিরে এসে অসংখ্য মৃত্যু ঘটিয়ে শত্রু বাইজেন্টাইনদের সুবিধা করে দেয়। আল-সুয়ুতি (মৃ. ১৫০৫) মনে করেন যে প্লেগটি তার প্রাথমিক প্রাদুর্ভাবের খুব বেশি দিন পরে পুনরায় আবির্ভূত হয়েছিল, তাই ৬৩৮ ও ৬৩৯ – এই দুটি তারিখ পাওয়া যায়।

সিরিয়ায় নয় মাসের খরার সময় এক পর্যায়ে প্লেগ আঘাত হেনেছিল, যাকে আরবরা ‘ছাই-এর বছর’ (‘Year of the Ashes’) বলে অভিহিত করেছিল। সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের ফলে মানুষের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া ও এর ফলে শহর ও গ্রামগুলোতে খাদ্যের মজুদ করার কারণেই সম্ভবত প্লেগের জন্য মঞ্চ তৈরি করে দেয়, কেননা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে মানুষ প্লেগ জীবানূর প্রতি বেশি সংক্রমণযোগ্য হয়ে ওঠে, এবং খাদ্যের মজুদ থাকলে প্লেগবাহী ইঁদুর দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে দ্রুত প্লেগ ছড়িয়ে দেয়। এটি সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে ইরাক ও মিশরকেও আক্রমণ করে। এরপর শাওয়াল ১৮ হিজরি/ অক্টোবর ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে এটি হ্রাস পায়।

প্রতিক্রিয়া এবং তাৎক্ষণিক প্রভাব

ইসলামী ঐতিহ্যবাহী উৎসগুলির মধ্যে একটি প্রধান বিবরণ অনুসারে, উমর, তার শীর্ষ কমান্ডার আবু উবাইদার অসুস্থতার জন্য তাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে তাকে মদিনায় সমন করেন; আবু উবাইদা, উমরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তিনি তার লোকদের পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করেছিলেন। পরে উমর পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য সিরিয়ার দিকে যাত্রা করেন, সারগ (মদিনার উত্তরে তেরো দিনের পদযাত্রা) নামে একটি মরুভূমির স্টপে সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের সাথে তিনি বৈঠক করেন। তার প্রথম বৈঠক ছিল মুহাজিরুন ও আনসার গোষ্ঠীর নেতাদের সাথে। এরা ছিল নবগঠিত মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম ধর্মান্তরিত ও এলিট, যারা মহামারী-অধ্যূষিত অঞ্চল থেকে পলায়ন করার বিরুদ্ধে যুক্তি দেন। এদের সাথে দ্বিমত হয়ে উমর কুরায়েশ গোত্রের লোকেদের সাথে যারা মুহম্মদের গোত্রের লোক ছিল এবং পরবর্তীতে ধর্মান্তরিত হয়। তারা প্রস্তাব দেন সেনাবাহিনীদেরকে মহামারি অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে ফিরিয়ে আনা উচিৎ। উমর এদের সাথে একমত পোষণ করেন। আবু উবাইদা এর বিরোধিতা করে মুহাম্মদের একটি কথিত নিষেধাজ্ঞাকে তার যুক্তির ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করান ও বলেন মুহাম্মদ প্লেগ অধ্যুষিত এলাকায় প্রবেশ করা ও সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়াকে নিষিদ্ধ করেছেন। উমর এর প্রত্যুত্তরে বলেন, একজন ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই অনুর্বর দিকের পরিবর্তে উপত্যকার সবুজ দিকটি বেছে নেবেন, কিন্তু ব্যক্তির সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, ঈশ্বরের ইচ্ছানুসারেই কাজ করতে হবে। এই আখ্যানটিকে ব্যবহার করে মধ্যযুগীয় মুসলিম পণ্ডিতগণ মহামারীতে আক্রান্ত অঞ্চল থেকে সেখানকার লোকেদের পালিয়ে যাওয়ার ন্যায্যতা প্রতিপাদন করত। সারঘ এর বৈঠকের সমাপ্তি ঘটে আবু উবাইদাকে দেয়া উমরের একটি স্বাস্থ্যকর স্থানে সেনাবাহিনীকে নিয়ে আসার আদেশ ও উমরের মদিনায় ফিরে যাবার মাধ্যমে।

আবু উবাইদা হাওরান অঞ্চলের পুরনো ঘাসানিদ রাজধানী জাবিয়ায় সেনাবাহিনীর শিবির স্থাপন করার জন্য চলে যান। সেখানে সুস্থ জলবায়ুর কারণে, জাবিয়া কার্যকরভাবে প্লেগ-আক্রান্ত সৈন্যদের জন্য একটি স্যানেটোরিয়াম এবং যুদ্ধের লুণ্ঠন বিতরণের কেন্দ্র হিসাবে কাজ করেছিল। সেখানে যাওয়ার পথে ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে আবু উবাইদা প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার উত্তরসূরি মু’আয ইবনে জাবাল এবং মু’আয এর দুই স্ত্রী ও পুত্র (বা তার পুরো পরিবার) তৎক্ষণাৎ মারা যান এবং মু’আয এর উত্তরসূরি ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান মারা যান। শুরাহবিলও প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত অন্যান্য বিশিষ্ট মুসলমান এবং সেনাবাহিনীতে মুহাম্মদের সাহাবিদের মধ্যে ছিলেন সুহাইল ইবনে আমর, সুহেলের পুত্র আবু জান্দাল, আল-ফাদল ইবনে আব্বাস, আল-হারিথ ইবনে হিশাম এবং আল-হারিথের সত্তর পরিবারের অনেক সদস্য যারা সিরিয়ায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। আমর ইবনে আল-আসকে জীবিত মুসলিম সৈন্যদের জাবিয়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কৃতিত্ব দেওয়া হয়। ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে তিনি মিশর বিজয়ে যাত্রা শুরু করেন, হয় তিনি উমরের অনিচ্ছাকৃত অনুমোদন নিয়ে অথবা খলিফার কোন অনুমোদন ছাড়াই মিশর বিজয়ে রওনা হন।

ইসলামী ঐতিহ্যবাহী হিসাব অনুযায়ী, সিরিয়ায় ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ মুসলিম সৈন্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা প্লেগে মারা যায়। ৬৩৯ সালের মধ্যে, ৬৩৭ সালে যে প্রায় ২৪,০০০ সৈন্য জাবিয়ায় গিয়েছিল তাদের মধ্যে মাত্র ৪,০০০ মুসলিম সৈন্য অবশিষ্ট ছিল, যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদ ফ্রেড ডোনার উল্লেখ করেছেন যে নিখোঁজ সৈন্যদের মধ্যে কতজন মারা গেছে বা সাময়িকভাবে পালিয়ে গেছে এবং শেষ পর্যন্ত সিরিয়ায় ফিরে এসেছে তা স্পষ্ট নয়।

এই প্লেগের ফলে সিরিয়ার স্থানীয় খ্রীষ্টান জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। এর ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং দ্রব্যের মজুদকরণও দেখা দেয়, যার ফলে উমর দ্রব্যের জমাকরণ বা হোর্ডিং নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হন। আল-তাবারির (মৃ. ৯২৩) মতে, সারঘ থেকে মদিনায় ফিরে আসার পর উমর তার উপদেষ্টাদের সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে তার সৈন্যদের সাথে দেখা করার এবং প্লেগের দ্বারা সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার মূল্যায়ন করার ইচ্ছার কথা জানান। ৬৩৯ সালে তার কথিত সফরের সময়, তিনি মহামারীতে মারা যাওয়া মুসলমানদের সম্পত্তির বিন্যাস সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন এবং কিছু সৈন্যের সন্দেহজনক দাবির নিষ্পত্তি করেছিলেন।

দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

উমর সিরিয়ায় তার শীর্ষ কমান্ডারদের মৃত্যুর ফলে ইয়াজিদের ভাই এবং ডেপুটি, মু’আবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ানকে নিযুক্ত করেছিলেন, যিনি সেখানে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। আর এর সিদ্ধান্তের ফলেই শেষ পর্যন্ত ৬৬১ সালে মু’আবিয়া সিরিয়া-কেন্দ্রিক উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ইতিহাসবিদ উইলফার্ড মাদেলুং অনুমান করেন যে, উমর মুয়াবিয়াকে তেমন পছন্দ করতেন না, অনেকেই তখন ছিলেন যারা এই কাজে মুয়াবিয়ার চেয়ে যোগ্য ও উমরের পছন্দের ছিলেন। কিন্তু সিরিয়ার প্লেগের কারণেই উমর তার সবচেয়ে কম পছন্দের মুয়াবিয়াকে এই কাজের জন্য বেছে নেন। আমওয়াস প্লেগের কারণে সিরিয়ায় মুসলিম সৈন্যদের যে ক্ষতি ও অভাব হয়েছিল তা মুয়াবিয়ার সিরিয়ায় পূর্ব থেকে প্রতিষ্ঠিত বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের প্রাক্তন মিত্র ও খ্রিস্টীয় আরব গোষ্ঠীসমূহের প্রতি প্রচণ্ডভাবে সামরিক দিক দিয়ে নির্ভরশীল হওয়াতে অবদান রাখে।

আমওয়াসের প্লেগের ফলে মূলনিবাসী খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর উপর ভারী ব্যাপক ক্ষতি এবং সিরিয়া থেকে ক্রমবর্ধমান হারে সিরিয়া ছেড়ে তাদের অভিবাসন ছিল উমাইয়া শাসনামলে (৬৪০-৭৫০) আরবদের দ্বারা সিরিয়ার ক্রমবর্ধমান বসতি স্থাপন এবং স্থানীয় সমাজে তাদের অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী কারণ। ঐতিহাসিক লরেন্স কনরাডের মতে, যেসব আরবরা বিজিত অঞ্চলে অ-আরবদের কাছ থেকে সংগৃহীত পোল ট্যাক্স ও রাজস্বের উপর নির্ভর করে সিরিয়ায় বাস করত, তারা আসলে সিরিয়ায় বসতি স্থাপন করতে সিরিয়ায় আসেনি, বরং প্লেগ পরবর্তী জনমানবহীন সিরিয়ায় পুনঃজনসমাগমের জন্য জোরপূর্বক উমাইয়া শাসনামলে এদেরকে নিয়ে আসা হয়েছিল। এটা প্রমাণিত যে সিরিয়ায় আরব উপজাতিদের বসতি স্থাপনের নীতি ব্যতিক্রমী ছিল, যেখানে অন্যান্য মুসলিম বিজিত অঞ্চলে দেখা যায় আরবরা কেবল নতুন নির্মিত গ্যারিসন সিটি বা সেনাশিবির শহরগুলোতেই বসতি স্থাপন করত।

আমওয়াসের পর আরবরা প্রথমে ফিলিস্তিনের লিদ্দা এবং/অথবা জেরুজালেমে তাদের হেডকোয়ার্টার স্থাপন করে, আর তারপর তারা রামলায় তাদের হেডকোয়ার্টার স্থাপন করে। রামলারটি তৈরি করেছিলেন ৮ম শতকে উমাইয়া খলিফা সুলায়মান ইবনে আব্দ-আল-মালিক। ১৮৭০ এর দশকের মত সময়েও আমওয়াস গ্রামে একটি কূপ ছিল যার নাম ছিল বির আল-তা’উন, যার অর্থ হচ্ছে প্লেগের কূপ। সুলাইমানের ক্ষমতায় আরোহনের পূর্ব পর্যন্ত জাবিয়াতেই আরবদের প্রধান সামরিক ঘাঁটি বর্তমান ছিল।

ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা

আধুনিক ঐতিহাসিকরা একমত হন যে আমওয়াসের প্লেগের প্রকৃত পরিস্থিতি কখনও পুরোপুরি জানা যাবে না, তাই তারা মূলত ৮ম-১০ম শতাব্দীর ইসলামী ইতিহাস এবং হাদিসের সংকলনের ঘটনার বর্ণনার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, যেগুলো রচিত হয়েছিল মুসলিম পাপীদের অবস্থা এবং সংক্রমনের উপর ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের প্রেক্ষাপট – এসবের উপর ভিত্তি করে। ১৪শ শতাব্দীর ব্ল্যাক ডেথ পর্যন্ত অন্য যে কোনও মহামারীর চেয়ে মধ্যযুগীয় আরবি সাহিত্যে আমওয়াসের প্লেগ বেশি মনোযোগ পেয়েছিল। ঐতিহাসিক জাস্টিন কে. স্টেইন্সের মতে, উৎসগুলির দ্বারা প্লেগের উপস্থাপনাগুলি “বৈচিত্র্যময় এবং পরস্পরবিরোধী। মুহাম্মদের সাহাবি উমর, আবু উবাইদা, আমর এবং মু’আযের প্লেগের প্রতিক্রিয়ার বিবরণগুলি মধ্যযুগ জুড়ে মহামারী নিয়ে পণ্ডিতদের ধর্মীয় ও আইনী ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করে, যা ব্ল্যাক ডেথ নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়াও নির্ধারণ করে দেয়।

মধ্যযুগীয় মুসলিম পন্ডিতরা আমওয়াসের প্লেগের সমসাময়িক প্রতিক্রিয়া থেকে তিনটি নীতিকে প্রতিপাদিত করেছিলেন: প্রথমটি ছিল যে প্লেগটি ছিল মুসলিম বিশ্বাসীদের জন্য ঐশ্বরিক করুণা বা শাহাদাতের একটি রূপ এবং অবিশ্বাসীদের জন্য একটি শাস্তি; দ্বিতীয়টি ছিল, মুসলমানদের প্লেগ-আক্রান্ত ভূমিতে প্রবেশ বা পালিয়ে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা; এবং তৃতীয়টি ছিল প্লেগ সংক্রামক নয়, বরং এটি সরাসরি ঈশ্বরের দ্বারা আরোপিত। মধ্যযুগের মহামারীর পুনরাবৃত্তির সময় তত্ত্বগুলি ধারাবাহিকভাবে ধর্মতাত্ত্বিক মতানৈক্যের সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে মুসলিমদের প্লেগকে ঐশ্বরিক করুণা বা শাস্তি হিসাবে গ্রহণ করতে বাধার সৃষ্টি হয়, এবং বারবার এর সংক্রামকতা সামনে চলে আসে।

ডলসের মূল্যায়নে, প্লেগ সম্পর্কিত স্থানীয় খ্রিস্টান ও ইহুদি মনোভাব এবং প্রাকৃতিক মানুষের উদ্বেগগুলি সম্ভবত প্রথম নীতি, অর্থাৎ প্লেগকে ঈশ্বর প্রদত্ত করুণা বা শাস্তি হিসেবে দেখার দিকগুলোকে প্রভাবিত করেছিল। যারা প্লেগকে ঈশ্বরের দেয়া শাস্তি বলে মনে করতেন তারা সিরিয়ায় মুসলিম সৈন্যদের প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর জন্য তাদের নৈতিকতার অভাবকে দায়ী করেন। তারা সৈন্যদের দোষারোপ করে বলেন, এইসব মুসলিম সেনারা সিরিয়ায় গিয়ে মদ্যপান সহ অনেক অনৈতিক কাজ করা শুরু করে, তাই তাদের ওপর ঈশ্বরের এই ক্রোধ নেমে আসে। মনে করা হয় এর প্রতিক্রিয়াতেই উমর মদ্যপানকারীদেরকে দোররা মারার আদেশ দিয়েছিলেন। অন্য দিকে, আমওয়াসে ও সার্ঘ এর কাউন্সিলে দেয়া আবু উবাইদার বক্তৃতায় উঠে এসেছে প্লেগকে ঈশ্বর প্রদত্ত করুণা ও শাহাদাত এর দৃষ্টিভঙ্গিটি। দামেস্কো-ভিত্তিক ঐতিহাসিক ইবনে আসাকির (মৃ. ১১৭৫) আমওয়াসের প্লেগ সম্পর্কে একটি কবিতা নথিভূক্ত করেছিলেন, যা এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখায়, কবিতাটির কাব্যান্যবাদ দেয়া হলো –

কত সাহসী অশ্বারোহী এবং কত সুন্দর সুন্দর বিশুদ্ধ নারীকে ‘আমওয়াস উপত্যকায় হত্যা করা হয়েছিল’
তারা প্রভুর মুখোমুখি হয়েছিল, কিন্তু প্রভু তাদের প্রতি অবিচার করেননি
যখন তারা মারা যায়, তখন তারা বেহেশতের অ-পীড়িত লোকদের মধ্যে ছিল।
আমরা মহামারী সহ্য করি, এবং এর সান্ত্বনা হিসেবে আমাদেরকে মৃত্যু দান করা হয়েছিল।

পূর্বনির্ধারিত নীতির উপর ভিত্তি করে, আমওয়াসের ঘটনাগুলি তর্ক করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল যে কোনও ব্যক্তি পালিয়ে যায় বা প্লেগ-প্রভাবিত এলাকায় থাকে কিনা তাদের মৃত্যু ইতিমধ্যে ঈশ্বরের দ্বারা নির্ধারিত হয়েছিল। ইরাকের গ্যারিসন শহর কুফায় প্লেগের এক পর্বের সময়, বিশিষ্ট রাষ্ট্রনায়ক এবং পণ্ডিত

পূর্বনির্ধারণবাদ, অর্থাৎ ঈশ্বর আমাদের মৃত্যু ঠিক করে দিয়েছে – এই নীতিকে সমর্থন করার জন্য আমওয়াসের প্লেগকে ব্যবহার করা হয়, আর তার ভিত্তিতেই প্লেগ আক্রান্ত এলাকার লোকেদের জন্য ঈশ্বর ইতিমধ্যে মৃত্যু নির্ধারণ হয়ে গেছে কিনা, সেখানকার লোকেদের পালিয়ে যাওয়া অনুমোদিত কিনা তা নিয়ে বিতর্ক দেখা যায়। ইরাকের সেনাশিবির শহর বা গ্যারিসন সিটি কুফায় বিশিষ্ট নেতা ও পণ্ডিত আবু মুসা আল-আশারির (মৃ. ৬৬২) বাড়িতে কারও একজন প্লেগ হয়েছিল, তাই তিনি তার বাড়িতে আসা অতিথিদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি সারঘ-এ উমরের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে প্লেগাক্রান্ত অঞ্চল থেকে মুসলিমদের পালিয়ে যাওয়ার ন্যায্যতা প্রতিপাদন করেছিলেন। সেই সাথে তিনি সংক্রামক রোগের অস্তিত্বও স্বীকার করেছিলেন, যদিও হাদিসে একে প্রাক-ইসলামী তত্ত্ব বলে অস্বীকার করা হয়।

ব্রিটেইন ও আয়ারল্যান্ডের ৬৬৪ সালের প্লেগ

৬৬৪ খ্রিস্টাব্দের প্লেগ একটি মহামারী ছিল যা প্রথম প্লেগ মহামারীর সময় ৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডকে আক্রান্ত করেছিল। এটি ছিল ইংল্যান্ডের ইতিহাসে প্রথম রেকর্ডকৃত মহামারী, এবং মহামারিটি একটি সূর্যগ্রহণের ঘটনার সাথে মিলে গিয়েছিল। পরবর্তী নথিগুলোতে একে “৬৬৪ এর হলুদ প্লেগ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, এবং বলা হয়েছিল যে এটি বিশ বা পঁচিশ বছর ধরে স্থায়ী হয়েছিল, যার ফলে ব্যাপক মৃত্যু ঘটে, সামাজিক বিঘ্নের সৃষ্টি হয় এবং অনেক মানুষ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ত্যাগ করে। এর জন্য দায়ী রোগটি হয় প্রথম প্লেগ মহামারীর অংশ হিসেবে প্লেগ ছিল, নয়তো গুটিবসন্ত ছিল।

আইরিশ অ্যানালস অফ টাইগারনাখ অনুসারে, প্লেগের আগে ৬৬৪ সালের ১লা মে-তে একটি সূর্যগ্রহণ হয়েছিল (১লা মে, ৬৬৪ সালে পূর্ণগ্রহণের পথ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শুরু হয়েছিল, মেক্সিকো উপসাগর অতিক্রম করেছিল, উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলে প্রবাহিত হয়ে আয়ারল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ড অতিক্রম করেছিল এবং মধ্য ইউরোপে অব্যাহত ছিল)। বেদেও সূর্যগ্রহণটির কথাও উল্লেখ করেন, তবে তিনি ভুল করে ৩রা মে এর কথা লেখেন। আইরিশ সূত্রগুলি দাবি করেছে যে ব্রিটেনে এই সময়ে একটি ভূমিকম্প হয়েছিল এবং প্লেগটি আয়ারল্যান্ডে প্রথমে ম্যাগ নিথায় প্রবেশ করে ও লিনস্টারের ফোথাইর্টরা প্রথম আক্রান্ত হয়। বেদে দাবি করেছিলেন যে প্লেগটি প্রথমে ব্রিটেনের দক্ষিণে আসে এবং তারপরে উত্তরদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

বেদে এই বিষয়ে লিখেছিলেন, “৬৬৪ সালের মে মাসের তৃতীয় দিনে, দিনের দশম ঘন্টার কাছাকাছি সূর্যের একটি গ্রহণ ঘটেছিল। একই বছরে, হঠাৎ করে আসা একটি মহামারী প্রথমে ব্রিটেনের দক্ষিণাঞ্চলে জনবসতি হ্রাস করে, এবং পরে নর্থমব্রিয়ানদের প্রদেশ আক্রমণ করে, এটি দেশটিকে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ধ্বংস করে দেয় এবং প্রচুর সংখ্যক মানুষকে হত্যা করে। এই প্লেগের কারণে যাজক,তুডার মৃত্যু হ , এবং তাকে সম্মানজনকভাবে পাগনালেখ নামক মঠে সমাহিত করা হয়। তদুপরি, আয়ারল্যান্ড দ্বীপে এই প্লেগটির ছড়িয়ে পড়া কম বিপর্যয়কর ছিল না। সেই সময়ে ইংরেজদের অভিজাত ও নিম্নশ্রেণীর অনেকে আয়ারল্যান্ডে ছিল। তারা বিশিপ ফিনান এবং কোলম্যানের সময়ে তাদের জন্মভূমিকে পরিত্যাগ করে পবিত্র অধ্যয়নের জন্য বা অধিকতর তপস্বী জীবনের জন্য নিজেদের কার্য থেকে অবসর গ্রহণ করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ একটি সন্ন্যাসী জীবনের প্রতি বিশ্বস্ততার সাথে নিজেকে উৎসর্গ করেছিল, অন্যরা অধ্যয়নের জন্য নিজেদেরকে নিযুক্ত করেছিল, এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করত। স্কটিশরা স্বেচ্ছায় তাদের সবাইকে গ্রহণ করেছিল, এবং তাদের বিনা খরচে প্রতিদিনের খাবার সরবরাহ করত, পাশাপাশি তাদের পড়াশোনার জন্য বই সরবরাহ করত।”

সমসাময়িক আইরিশ মঠাধ্যক্ষ ও সেইন্ট আইওনার অ্যাডোমনানের মতে, আধুনিক স্কটল্যান্ডের একটি বিশাল অঞ্চল ব্যতীত ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের সর্বত্র প্লেগ প্রভাবিত হয়েছিল। অ্যাডোমনান প্লেগকে পাপের জন্য একটি ঐশ্বরিক শাস্তি হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন যে উত্তরাঞ্চলীয় গ্রেট ব্রিটেনে বসবাসকারী পিক্টস এবং আইরিশরা সেইন্ট কলম্বার সুপারিশের কারণে প্লেগ থেকে রক্ষা পেয়েছিল, যারা তাদের মধ্যে মঠ প্রতিষ্ঠা করেছিল। অ্যাডোমনান ব্যক্তিগতভাবে প্লেগের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে হেঁটে গিয়েছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে তিনি বা তার সঙ্গীরা কেউই অসুস্থ হননি।

সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে আমওয়াস প্লেগের পুনরাবৃত্তি (৬৮৮/৮৯ – ৭৪৪/৪৫ খ্রি.)

৬৮৮/৮৯ থেকে ৭৪৪/৪৫ এর মধ্যে প্রায় প্রতি দশকে সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে প্লেগের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ডলস-এর ভাষায় “উমাইয়া রাজবংশ আক্ষরিক অর্থেই এই রোগে জর্জরিত ছিল”। উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় মুয়াবিয়া (রা. ৬৮৩-৬৮৪ খ্রি.), প্রথম মারওয়ান (রা. ৬৮৪-৬৮৫ খ্রি.), আব্দ আল-মালিক (রা. ৬৮৫-৭০৫ খ্রি.), সুলাইমান (রা. ৭১৫-৭১৭ খ্রি.) এবং ইরাকের উমাইয়া গভর্নর আল-মুগিরা ইবনে শুবা (রা. ৬৬১-৬৭১ খ্রি.) এবং জিয়াদ ইবনে আবিহি (রা. ৬৮৫-৬৭৩ খ্রি.) এর মৃত্যু সম্ভবত সিরিয়া ও ইরাকের প্লেগ মহামারীর কারণে হয়ে থাকতে পারে। খলিফারা গ্রীষ্মের মাসগুলিতে প্লেগের আবির্ভাবের সময় নিয়মিতভাবে শহর থেকে তাদের মরুভূমির প্রাসাদগুলিতে ফিরে আসেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন খলিফা হিশাম (রা. ৭২৪-৭৪৩ খ্রি.), যিনি দামেস্কের চেয়ে রুসাফায় তার প্রাসাদকে পছন্দ করেছিলেন কারণ তিনি দামেস্ককে সেই সময়ে অস্বাস্থ্যকর বলে মনে করতেন।

ডলস অনুমান করেন যে ঘন ঘন প্লেগের এই পুনরাবৃত্তিগুলি উমাইয়া খিলাফতের কেন্দ্র সিরিয়া-প্যালেস্টাইনের স্বাভাবিক জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে জনসংখ্যার ধারাবাহিকভাবে হ্রাস করে থাকতে পারে এবং এর মাধ্যমে উমাইয়া শক্তিকে দুর্বল করে দিয়ে থাকতে পারে। এদিকে উমাইয়া খিলাফতের সুদূর পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ খোরাসান আপাতদৃষ্টিতে প্লেগ মহামারী থেকে রক্ষা পেয়েছিল। এর ফলে সেখানে অনেক আরব উপজাতীয় অভিবাসন ঘটে, যার ফলে খিলাফতের পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ পারস্য, খোরাসান ইত্যাদি অঞ্চলেই জনগণের এককভাবে বৃদ্ধি ঘটে, আর তাই পরবর্তীতে আব্বাসীয় আন্দোলনের উত্থানে ভূমিকা রাখে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত ৭৫০ সালে উমাইয়া রাজবংশের পতন ঘটে। কনরাডের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই প্লেগ চক্রের শেষে উমাইয়ারা খিলাফতের পূর্বাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ কার্যত হারিয়ে ফেলে এবং “রাজবংশের শেষ বছরগুলির অন্তহীন প্লেগগুলো আব্বাসীয় বিপ্লবের বিজয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।”

তথ্যসূত্র : First plague pandemic, Plague of Justinian, Plague of Mohill, Roman Plague of 590, Plague of Sheroe, Plague of Amwas, Plague of 664

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.




This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.