জঙ্গিবাদ প্রবণতা তৈরির ক্ষেত্রে অনেকাংশেই দায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধ

জঙ্গিবাদ বর্তমান বিশ্বের একটি অন্যতম সমস্যা ও সব থেকে উত্তপ্ত টপিকগুলোর মধ্যে একটি। জঙ্গিবাদকে ঠেকানোর জন্য সব সময়ই নতুন নতুন পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে, নেয়াও হচ্ছে। কিন্তু কোন সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে সেই সমস্যার কারণ জানাটা আবশ্যক। আর সেই কারণটি খুঁজে বের করার জন্য অনেক বিজ্ঞানীই কাজ করে চলেছেন। সম্প্রতি নিউরোলজিস্টরা কিছু মানুষের, বিশেষ করে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে সদস্য হবার প্রবণতা দেখান এরকম মানুষের মস্তিষ্কে স্ক্যান করে এই বিষয়ে কিছু খুঁজে পেয়েছেন।

জঙ্গিরা সাধারণত দাবি করে যে তারা ধর্ম ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে জঙ্গিবাদে অনুপ্রাণিত হয়েছে। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীগণ বরাবরই বলে আসছেন যে, কোন ধর্ম বা রাজনৈতিক মতবাদের প্রতি ভক্তি থেকে নয়, বরং ক্ষোভের একটি অস্পষ্ট অনুভূতির কারণেই জঙ্গিবাদে মানুষ বেশি জড়ায়।

এই গবেষণাটি করার জন্য মনোবিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল fMRI স্ক্যান ব্যবহার করেছে। তাদের আবিষ্কারটি ফ্রন্টিয়ারস ইন সাইকোলজি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি সমাজবিজ্ঞানীদের সেই সিদ্ধান্তটিকেই সমর্থন করছে। বলছে যে, ব্যক্তির জঙ্গিবাদে জড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধ (Social exclusion) বা সমাজ আমাকে গ্রহণ করে না, আমি সমাজের কেউ নই – এরকম অনুভূতি দায়ী।

এই গবেষণার জন্য প্রথমে বারসেলোনার ৫৩৫ জন মরোক্ক বংশীয় তরুণদের নিয়ে সারভে করা হয়। সারভেতে জানার চেষ্টা করা হয় যে, তারা ইসলামী উদ্দেশ্যগুলোকে ত্বরান্বিত করার জন্য সহিংসতার ব্যবহারকে কিভাবে দেখে। গবেষণার জন্য স্পেইনের বারসেলোনা শহরটিকেই বাছাই করা হয়েছে, কেননা কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ বলছে যে ইউরোপের যেকোন অঞ্চলের তুলনায় বারসেলোনাতেই মরোক্কানরা সব থেকে কম পরিমাণে সমাজের সাথে অঙ্গীভূত হয়। গবেষণাটি চলার সময়ই বারসেলোনায় একটি জঙ্গি হামলা ঘটে। সারভেটি থেকে যাদেরকে জঙ্গিবাদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রবণ হিসেবে বাছাই করা হয়েছিল তাদের মধ্যে ৩৮ জন এই গবেষণায় তাদের মস্তিষ্কে স্ক্যানিং এর জন্য রাজি হয়।

আরও কিছু প্রশ্ন করার পর এদেরকে একটি কম্পিউটার গেম খেলতে দেয়া হয়, যার নাম ছিল সাইবারবল। অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেককেই স্প্যানিশ নামের ও চেহারার একজন ভারচুয়াল চরিত্র হয়ে খেলতে দেয়া হয়, যাতে তারা এই গেমে বিচ্ছিন্নতাবোধ বা বঞ্চনাবোধ অনুভব করেন। এদের দলটির নাম দেয়া হল এক্সক্লুডেড গ্রুপ বা বিচ্ছিন্ন দল। বাকি অর্ধেক নিজেদের নাম ও চেহারায় খেলেছিল। এরপর খেলা চলাকালীন সময়ে এদের ব্রেইন স্ক্যানের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যক্রম যাচাই করা হয় ও সেই সাথে তখন বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়।

এই স্ক্যানের ফলাফল হিসেবে পাওয়া গেল, এদের মধ্যে যারা ইসলামী উদ্দেশ্যকে প্রমোট করতে সহিংসতাকে ব্যবহার করবার ইচ্ছা পোষণ করেছিল তাদের সকলের মস্তিষ্কের লেফট ইনফেরিয়র ফ্রন্টাল জাইরাস উচ্চ মাত্রায় সক্রিয়। এই অংশটি সেই সব বিষয়ের সাথে জড়িত যেগুলোকে ব্যক্তি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন যে তার জন্য জীবন দিতে পারে্ন। দেখা যায়, বিচ্ছিন্ন দলের খেলোয়াররা তাদের খেলার উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য খেলাটিতে লড়াই করে মারা যেতে বেশি ইচ্ছুক ছিল, আর তাদের লেফট ফ্রন্টাল জাইরাসের সক্রিয়তা বেশি শক্তিশালী ছিল।

এছাড়া, পূর্বে যেসকল কারণকে তারা তাদের সহিংসতাকে জাস্টাফাই বা ন্যায্যতা প্রতিপাদনের জন্য ব্যবহার করেনি, সেসব নিয়ে আলোচনা করার সময় তাদের মস্তিষ্কে যেরকম কার্যক্রম দেখা যায়, তারা যেসব বিষয়কে মৌলবাদী বলে মনে করে সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেও মস্তিষ্কে একই রকম কার্যক্রম দেখা যায়। মানে, এইসময়ে তাদের কাছে মৌলবাদী ও অমৌলবাদী উভয় বিষয়ই একই রকম প্রতিভাত হয়। এর অর্থ হচ্ছে এদেরকে নিরাপদ বিষয় নিয়ে প্রশ্নের প্রতিক্রিয়াতেও জঙ্গি-সদৃশ মস্তিষ্ক কার্যক্রম তৈরির জন্য সামান্য সময়ের এই অনলাইন বিচ্ছিন্নতাবোধই যথেষ্ট ছিল। এবারে একটু ভেবে দেখুন, সারা জীবনভর একই রকম বিচ্ছিন্নতাবোধ এদের মন বা মস্তিষ্ককে কোন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে।

গবেষণার প্রধান ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন এর ডঃ নাফিস হামিদ বলেন, “আমরা এটা বলছি না যে সামাজিক বিচ্ছন্নতা সহিংসতাকে উৎসাহিত করবার একটি মাত্র ফ্যাক্টর, কিন্তু এটা ঠিক যে এটা সহিংসতা বা জঙ্গিবাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।”

যদি হামিদ ও তার সহকর্মীরা সঠিক হন, তাহলে যে কোন কাজ, যা জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে তাদের দেশে বিচ্ছিন্নতাবোধ বা বঞ্চনাবোধের জন্ম দেয়, তাই ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সহিংসতার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। যখন জঙ্গি হামলা ঘটে, তখন সেই জঙ্গি হামলার জন্য তাদের পুরো সম্প্রদায়কে দোষ দেয়া হয় তখন সেই সম্প্রদায়ের লোকেদের দেশটিতে উপস্থিতির বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। সেক্ষেত্রে এই আচরণ সেই সম্প্রদায়ের লোকেদেরকে জঙ্গি হতে আরও বেশি উৎসাহিত করে।

তবে জঙ্গিবাদের কেন্দ্রে যে মাথারা থাকে তারা কী এই বিষয়টা ভালভাবে জেনেই জঙ্গি হামলা চালায়? অমুসলিমরা যে সব অঞ্চলে সংখ্যাগুরু সেখানে ইসলামিক টেরোরিস্টরা যদি জঙ্গি হামলা করে, তাহলে সমাজ গোটা মুসলিম সম্প্রদায়কে দোষারোপ করবে, এতে অনেক মুসলিম তরুণ সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবোধ বা বঞ্চনাবোধের কারণে জঙ্গি হবে, তাতে লাভ হবে সেই টেরোরিস্ট অরগানাইজেশনের। হতে পারে না?

নোয়াহ হারারি তার “the Theatre of Terror” প্রবন্ধে কিছুটা এরকমই লিখেছিলেন। জঙ্গি সংগঠনের শক্তি এতটা কখনই থাকে না যে তারা কোন কনভেনশনাল ওয়ারে গিয়ে শত্রুদের মধ্যে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে। তাদের ক্ষমতা অনেক কম থাকে, আর এখানে তারা কোন আর্মি জেনারেল নয়, বরং রঙ্গমঞ্চের প্রয়োজক (theatre producer) হিসেবে কাজ করে। তারা তাদের কাজের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় সৃষ্টি করতে চায়, যার ফলে সমাজ আরও রক্ষণশীল বা মৌলবাদী বা আমূল সংস্কারবাদী (radical) অবস্থায় চলে যায়, আর ভুল পদক্ষেপগুলো নেয়। তারা প্রত্যক্ষভাবে শত্রুর ক্ষতি করতে চায় না, বরং একজন তাই চি মাস্টারের মত শত্রুকে শত্রুর দ্বারাই ক্ষতি করতে চায়। আর আধুনিক রাষ্ট্রগুলোও একসময় নিজের মেজাজ ঠিক রাখতে না পেরে বলপ্রয়োগের সাথে ও জনগণের সামনে বড় রকমের প্রতিক্রিয়া দেখায়, যেক্ষেত্রে আদতে সেই জঙ্গি সংগঠনগুলোরই লাভ হয়। হারারির এই কথাগুলো ভেবে দেখবার মত।

তথ্যসূত্র:
১। গবেষণাটির অনলাইন জার্নাল লিংক: Neural and Behavioral Correlates of Sacred Values and Vulnerability to Violent Extremism

২। নোয়া হারারির “the theatre of terror”: Yuval Noah Harari: the theatre of terror

বাংলায় অনুবাদ – “সন্ত্রাসের রঙ্গমঞ্চ” : https://blog.mukto-mona.com/2017/03/29/50395/



Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.




This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.