উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক পারমাণবিক বিষ্ফোরণ ও পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা

সাউদ কোরিয়ানরা ৫ম নর্থ কোরিয়ান নিউক্লিয়ার উইপন টেস্ট এর নিউজ রিপোর্ট দেখছে

উত্তর কোরিয়া নিশ্চিত করেছে যে তারা তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী নিউক্লিয়ার ডিভাইসটিকে ডেটোনেট করেছে। এটা করা হয়েছে দেশটির প্রতিষ্ঠার ৬৮ তম বার্ষিকীতে, আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে ঘটনাটি সেই অঞ্চলে যথেষ্ট উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।

এর আগে এই বছরের জানুয়ারি মাসে আরেকটি বিষ্ফোরণ সংঘটিত করা হয়েছিল। সেক্ষেত্রে কোন ধরণের নিউক্লিয়ার ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছিল তা পরিষ্কার ছিল না। যাই হোক, সম্প্রতি এই বিষ্ফোরণটি ঘটানোর ফলে যে সিসমিক ওয়েভ তৈরি হয়েছে সেটার দ্বারা পৃথিবীকে এই বিষ্ফোরণের বেলায় ঠিক কী ধরণের নিউক্লিয়ার ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে তার একটা উত্তর হয়তো দেয়া সম্ভব হবে।

৯ই সেপ্টেম্বর ০০ঃ৩০ এএম ইউটিসি সময়ে ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিকাল সার্ভে (USGS) Punggye-ri subterranean টেস্ট সাইট থেকে একটি কম্পন রেজিস্টার করে, যেখানে ২০০৬ সাল থেকে উত্তর কোরিয়ার মিলিটারিরা ৫টা নিউক্লিয়ার বিষ্ফোরণই ঘটায়।

এই বিশেষ সিউডো কোয়াক (অপ্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট ভূমিকম্প) ছিল ৫.৩ মাত্রার, যা এই অঞ্চল থেকে আসা সিসমিক ওয়েভগুলোর মধ্যে ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। প্রথম ওয়েভফর্মটা হঠাৎ করে আসে। আর এরপর বিভিন্ন আকারের ওয়েভফর্ম অবিরাম আসতে থাকে। তাই ধরেই নেয়া যায় বিষ্ফোরণটি যথেষ্ট বড়সড়ই ছিল।

ভূমিকম্পের এপিসেন্টার

৬ জানুয়ারিতে উত্তর কোরিয়া সেই অঞ্চলে একটি পারমাণবিক অস্ত্র ডেটোনেট করেছিল যাকে আরা হাইড্রোজেন বোম্ব বলে দাবী করে আসছিল এবং যেটি একই ওয়েভফর্মের ৫.১ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করেছিল। তখন এই বোম্বটি আসলেই হাইড্রোজেন বোম্ব ছিল কি ছিল না এটা নিয়ে একটা বড় রকমের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। হাইড্রোজেন বোম্ব একটি ডিভাইস যা অন্যান্য সাধারণ এটমিক বোম্ব এর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং বিধ্বংসী।

বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ সাজেস্ট করেছিলেন যে এই সিসমিক ওয়েভ হাইড্রোজেন বোম্ব এর মত অত শক্তিশালী কোন কিছু থেকে তৈরি হয় নি। আসলে এই বিষ্ফোরণের ফলে যে শক্তি নিঃসৃত হয়েছিল তা হাইড্রোজেন বোম্ব এর মত শক্তিশালী কোন বোম্বের দশ ভাগের একভাগ ছিল, যার অর্থ হল এটা খুব সম্ভবত একটি প্লুটোনিয়াম বেজড এটমিক বোম্ব ছিল।

একই ব্যাপারটি এখনকার জন্যেও সত্য। বর্তমানে ঘটা ৫.৬ মাত্রার ভূমিকম্পটি এখনও কোন সাধারণ এটমিক বোম্ব দ্বারা তৈরি হয়েছে বলেই মনে হয়। এই বিষ্ফোরকের ইল্ড বা এক্সপ্লোসিভ ইল্ড মোটামুটি ১০ কিলোটনের কাছাকাছি হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার মেটেওরলজিকাল এজেন্সির কিম নাম উক গার্ডিয়ানকে বলেন, “এই ১০ কিলোটনের বিষ্ফোরণটি জানুয়ারি মাসের চতুর্থ নিউক্লিয়ার টেস্টের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি শক্তিশালী ছিল, এবং হিরোশিমা বোম্বিং এর চেয়ে কিছুটা কম ছিল”।

যাই হোক, উত্তর কোরিয়ার কেবল কম শক্তির পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ক্ষমতা থাকলেও ব্যাপারটা বেশ আশঙ্কাজনক, বিশেষ করে পরিবেশের ক্ষতির কথা চিন্তা করলে তাদের এই তৎপরতা ভয়াবহ। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায়  দেখা গেছে, চীন ও উত্তর কোরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মাউন্ট পায়েকচু (Mt. Paektu) নামের একটি সুপ্ত আগ্নেওগিরি উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক আন্ডারগ্রাউন্ড টেস্টগুলোর ফলে ডিস্টার্বড হচ্ছে।

জানুয়ারির বিষ্ফোরণের ফলে সৃষ্ট শকওয়েভ পায়েকচু পর্বতের ম্যাগমা চেম্বারে পৌঁছে যায় যা টেস্ট সাইট থেকে ১১৬ কিলোমিটার দূরে ছিল। এই এটোমিক বোম্ব শকওয়েভগুলো এই অঞ্চলে আভ্যন্তরীন চাপ তৈরি করছে যার ফলে ভবিষ্যতে এই পর্বত থেকে অগ্নুৎপাতের সৃষ্টি হতে পারে।

যদি উত্তর কোরিয়া কখনও হাইড্রোজেন বোম্ব তৈরি করে তাহলে এটা ৭ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করতে সক্ষম হবে। গবেষকগণ বলেছেন, এটা একাই আশেপাশের সব অঞ্চলের ম্যাগমা চেম্বারকে বিষ্ফোরিত করবে এবং ম্যাগমা সারফেসে উঠে আসবে।

এই আগ্নেওগিরির ফলে একসময় মানবেতিহাসের সবচেয়ে বড় অগ্নুৎপাতটি ঘটেছিল। যদি এটা এখন আবার শুরু হয় তাহলে এটা কেবল উত্তর কোরিয়া ও চীনের কিছু অংশকেই পুরোপুরি ধ্বংস করবে না, এতে পুরো পৃথিবীই এশ বা ছাই দ্বারা ছেয়ে যাবে এবং পৃথিবীর জলবায়ু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইতিমধ্যে বারাক ওবামা বলেছেন, এই গোপনতাপূর্ণ কমিউনিস্ট দেশটির দ্বারা এরকম উত্তেজনাপূর্ণ কর্মকাণ্ড মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির সৃষ্টি করবে, এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে পুনরায় উত্তর কোরিয়ার নিউক্লিয়ার উইপন প্রোগ্রামকে “গ্রেভ থ্রেট” বলে ঘোষণা করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন হে, কিম জং উনকে “বাতিকগ্রস্ত অদূরদর্শীতার” জন্য দায়ী করেছেন।

 

 

তথ্যসূত্র:

  1. https://www.theguardian.com/world/2016/sep/09/north-korea-nuclear-test-earthquake
  2. http://www.nature.com/articles/srep21477
  3. http://www.bbc.co.uk/news/world-asia-37314927
  4. http://www.bbc.co.uk/news/world-asia-35241686

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.